নাটক : নির্যাস
রচনা : তাহের শিপন

দৃশ্য – ১
সময় গভীর রাত। ঢাকা কক্সবাজার হাইওয়ে দিয়ে একটা বাস ছুটে চলছে। বাসের যাত্রীরা প্রায় সবাই ঝিমুচ্ছে। আমাদের নাটকের চরিত্ররাও ঝিমুচ্ছে। শুধু একটা তিন বছরের বাচ্চা বাসময় ঘুরে বেড়াচ্ছে। যাত্রীদের মধ্যে কেউ একজন বলে উঠলো- এই বাচ্চা কার ভাই, ধরেননা একটু, পইড়া যাইতে পারে। বাচ্চার মা ডাকে- রাফি, এই রাফি এদিকে আয়। রাফি তার মায়ের দিকে এগিয়ে যায়। কোলে উঠে তার মায়ের, তার পাশে তার খালামনি ওয়াক শব্দে বমি করতে উদ্যত হয়। মা বিরক্ত চোখে তাকায়। মায়ের নাম রিমা, খালামনির নাম শ্যামা।
রিমা : কিরে থামবি?
শ্যামা : বমি পেলে কি করবো?
রিমা : বাসে উঠলেই তোদের বমি পায়?
শ্যামা : তোদের মানে?
রিমা : আমি বাদে তোরা বাকী সবাইতো বমির ফ্যাক্টরী।
শ্যামা : ঢালাও দোষ দিওনা আপা।
রিমা : এই ঢালাও দোষ মানে, এই যে এতটা পথ এলাম একবারও আমাকে, রাফিকে ওয়াক করতে দেখেছিস, যাত্রাবাড়ি পার হতে না হতেতো একব্যাগ ভরে ফেললি।
শ্যামাকে টিল ডাউন করে দেখা যাবে হাতে পলিথিনের ব্যাগ। এমন সময় বাসের এটেনডেন্স
এসে বলে- এনি প্রবলেম আপা?
রিমা : না ঠিক আছে, পানি দেন এক বোতল।
এটেনডেন্ট : সামনের সিট কাভারে দেয়া আছে।
রিমা বোতল নিয়ে বলে- ও। শ্যামা বমির ব্যাগ আড়াল করে। রাফি আবার কোল থেকে নেমে
যায়। পাশের সিটের লোককে বলে- এটা কি? লোকটা হেসে রাফিকে কোলে নেয়।
রিমা : এই রাফি এদিকে আয়।
রাফি : না।
পাশের সিটের ভদ্রলোক বলেন – থাকুক না আমার কাছে।
রাতের অন্ধকারে বাস ছুটে চলছে।
কাট্

দৃশ্য – ২
সময় সকাল। একটা হোটেল। রাফি, রিমা আর শ্যামা একটা রিকশায় করে এসে নামে। শ্যামার
অবস্থা কাহিল। রাফি উৎফুল­। তারা হোটেলে উঠে। বারান্দায় তারা যে রুমে উঠে তার রেলিং ধরে দাড়িয়ে আছে শমিক। শমিক তাদের রুমে উঠা খেয়াল করে। শ্যামা আড়চোখে তাকে দেখে। শমিক হাসে। শ্যামা মুখ ঘুড়িয়ে নেয়, রুমে ঢুকে পড়ে। শমিকের রুম থেকে তার বাবা আশফাক আহেমেদ বের হয়ে বলেন-
আশফাক : কিরে চল।
শমিক : হ্যা চল।
দুজনে সিড়ি দিয়ে নেমে যায়।

দৃশ্য – ৩
শ্যামাদের রুম। বাথরুমের দরজা খোলা, শ্যামা মুখে পানি দিচ্ছে।
রিমা : এই রাফিকে দাঁত ব্রাশ করা।
শ্যামা : আমি পারবোনা।
রিমা : কি?
শ্যামা : তোমার ত্যাদোঢ় ছেলে পেস্ট খেয়ে ফেলে।
রিমা : যা বললাম কর।
শ্যামা : করছি বাবা করছি, রাফি রাফি।
রাফি রুমে নেই।
কাট্

দৃশ্য – ৪
রাফি খালি গায়ে ন্যাংটো হয়ে বারান্দায় দৌড়াচ্ছে। শ্যামা রুম থেকে বের হয়ে রাফিকে ধরার চেস্টা করে, এক পর্যায়ে ধরে ফেলে রুমে নিয়ে যায়।

দৃশ্য – ৫
সৈকতে বসে আছে শমিক আর তার বাবা। এক ভদ্রলোক, মাথায় ক্যাপ পড়া, এসে বসেন তাদের পাশে, তার নাম বকুল ভাই।
বকুল : কি শমিক খবর কি।
শমিক হাসে।
বকুল : তারপর আপনার এখন কেমন লাগছে।
আশফাক : অনেক ভাল, আফটার অল ফ্রেশ এয়ার, ঢাকায়তো টাকা দিয়েও আপনি কিনতে পারবেন না।
বকুল : ঠিক বলেছেন, লোকেশন দেখতে এসে আমারতো যেতেই ইচ্ছে করছে না, তাই কয়েকটা দিন স্টে করবো ঠিক করেছি, আমার ওয়াইফ আর শ্যালিকাকে আসতে ফোন করে দিয়েছি, আজকেই চলে আসবে।
শমিক : উনারা বোধহয় চলে এসেছেন, আপনার পাশের রুমেইকি উঠার কথা।
বকুল : হ্যা হ্যা তাইতো, দেখেছ নাকি।
শমিক সম্মতিসূচক মাথা নাড়ে।
বকুল ব্যস্ত হয়ে উঠে দাড়ায়।
বকুল : ইয়া আল্লাহ্ আমাকেতো বাসস্ট্যান্ডে যেতে বলেছিল, যাই দেখি কি অবস্থা, পরে দেখা হবে।
বকুল ভাই চলে যায।
আশফাক : লোকটা বউকে খুব ভয় পায় মনে হয়।
বকুল : তুমি পাওনা মনে হয়।
আশফাক : পাইতো বটেই।
দুজনে হাসে।
কাট্

দৃশ্য – ৬
রিমাদের রুম। বকুল ভাইয়ের প্রবেশ।
বকুল : পথে কোন কষ্ট হয়নিতো?
রিমা : তোমাকে না বলেছি, বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে দাড়িয়ে থাকবে।
বকুল : এটা কোন কথা হলো, বাস পৌছে সাড়ে পাঁচটায়, আমিতো তখন সূর্যোদয় দেখতে…
রিমা : আমার চাইতে সূর্যোদয় বড় হলো।
বকুল : না তা না, তবে সূর্যোদয়তো… আমি অবশ্য শমিকের কাছ থেকে খবর পেয়ে ছুটে এসেছি।
রিমা : শমিকটা আবার কে?
বকুল : এই পাশের রুমেই উঠেছে খুব ভাল ছেলে, ইঞ্জিনিয়ার, বাবাকে নিয়ে এসেছে, অসুস্থ , হাওয়া বদল আর কি।
রিমা : সব খবর নেয়া সাড়া।
বকুল : তুমিতো আমাকে চেন, আমি খুব ইনফরমেটিভ থাকার চেষ্টা করি।
রিমা : তোমার লোকেশন দেখার কি হলো?
বকুল : লোকেশন দেখেছি দুটো, আর একটা নির্জন বীচ দরকার, কালকে হিমছড়ির দিকে যাবো, যাবে নাকি?
রিমা : দেখি একটু রেস্ট নিই আগে, জানো কি হয়েছে.. দুই দিন দুপুরে আমি ঘুমাইনি।
বকুল : তাহলেত দেশ এবং জাতির বিরাট ক্ষতি হয়ে গেল।
রিমা : কি?
বকুল : না কিছুনা কিছুনা, শ্যামা কোথায়?
রিমা : গেছে কোথাও বীচের দিকে…।
বকুল : একা?
রিমা : কক্সবাজার কি তোমার মত এই প্রথম এল নাকি, আর ও একা একাই ঘুরতে ভালবাসে।
কাট্

দৃশ্য – ৭
শ্যামা সী বিচে একা একা হাটছে। মানুষ দেখছে। একসময় দেখে শমিক তার বাবার হাত ধরে পানির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। শ্যামার চোখে মুগ্ধতা। শমিক তার বাবাকে পানির গভীরে নিয়ে যেতে চেষ্টা করে। তার বাবা ভয় পায়। শ্যামা মজা পায়। একসময় অর্ধভেজা হয়ে শমিক আর তার বাবা উঠে আসে পানি থেকে। শ্যামার সামনে দিয়ে বাবা চলে যায়। শমিক দাড়ায়। শ্যামা হাসে।
শমিক : দেখা হলো আপনার ব্রাদার ইন ল এর সাথে।
শ্যামা : কই নাতো।
শমিক : হোটেলের দিকে গেলেনতো।
শ্যামা : ও, আমি অনেকক্ষন হলো বেরিয়েছি।
শমিক : একা।
শ্যামা : কেন অসুবিধা আছে?
শমিক : না মেয়েরা এখানে একা বেরোয় নাতো।
শ্যামা : আমি অনেকবার এসেছিতো এখানে, সব চেনা জায়গা।
শমিক : ও, যাবেন এখন হোটলের দিকে?
শ্যামা : আরেকটু থাকি।
শমিক : যাই পরে কথা হবে, ভিজে গেছি একদম।
শমিক চলে যেতে উদ্যত হয়ে—
শমিক : আমি শমিক আহমেদ।
শ্যামা : (হেসে) আমি শ্যামা।
শমিক হেসে এগিয়ে যায়। শ্যামা সমুদ্রের কাছে এগিয়ে যায়, পা ডুবিয়ে দাড়িয়ে থাকে। শমিক ঘাড় ঘুরিয়ে তাকে দেখে, অবাক হয়।
কাট্

দৃশ্য – ৮
হোটেলের বারান্দা। বকুল ভাই রাফিকে কোলে করে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টায় রত। পয়েন্ট অফ ভিউ শটে দেখা যাবে রিমা ঘুমাচ্ছে। শমিক ভিজে কাপড় নিয়ে ফিরে আসে।
শমিক : কি বকুল ভাই, ডিউটি?
বকুল : আর বলোনা ব্রাদার, আমার ওয়াইফ যদি দুদিন দুপুরে না ঘুমায়, মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো, বেড়াতে এসে পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছে। আমাদের দেশের মেয়েগুলোনা বিয়ের পরে কেমন যেন ঘুম কাতুরে হয়ে পড়ে। আর এই ত্যাদোড়কে দেখ এতক্ষন ধরে সাধাসাধি করছি, ঘুমের ধারে কাছে নেই, একটার পর একটা প্রশ্ন করেই যাচ্ছে।
শমিক হেসে নিজের রুমের দিকে এগিয়ে যায়।
বকুল : হাইসো না মিয়া, লেজটা কাটো টের পাবা।
বকুল ভাই পায়চারী করে।

দৃশ্য – ৯
সময় দিন। একটা পাহাড়ের অনেক উপরে শ্যামা দৌড়ে যাচ্ছে। একজন উপজাতিয় লোক তাকে একটা দা নিয়ে তাড়া করছে। একপর্যায়ে লোকটা দা দিয়ে শ্যামাকে কোপ দেবে।
কাট টু
সময় সন্ধ্যার পর। শ্যামা হোটেলের রুমে ঘুম ভেঙ্গে উঠে বসে হাফাতে থাকে। বিছানা থেকে নামে। মুখে পানি দেয়।

দৃশ্য – ১০
বারান্দা। দরজা খুলে শ্যামা বারান্দায় আসে। রেলিং ধরে দাড়ায়। বড় করে নিশ্বাস নেয়। শমিকের ডাকে সম্বিৎ ফিরে পায়। শমিক মাটিতে বসে কফি খাচ্ছে।
শমিক : ঘুম ভাঙ্গলো?
শ্যামা হাসে।
শমিক : বসুননা।
শ্যামা শমিকের উল্টোদিকে রেলিং ঘেষে বসে।
শমিক : কফি খাবেন।
শ্যামা মাথা নেড়ে সম্মতি দেয়। শমিক উঠে গিয়ে ইন্টারকমে কফির কথা বলে। এর মাঝে বকুল ভাই তার রুম থেকে বের হয়। শ্যামাকে বসে থাকতে দেখে এগিয়ে যান। শমিকও ফিরে আসে।
শমিক : বকুল ভাই কফি খাবেন?
বকুল : খেতে পারি।
শমিক বেরিয়ে যায়। বকুল ভাই বসে পড়েন দেয়াল ঘেষে শ্যামার মুখোমুখি। শমিকের বাবা শমিকের সঙ্গে বেরিয়ে আসেন। শমিক তার বাবার সঙ্গে শ্যামার পরিচয় করিয়ে দেয়।
আশফাক : তারপর কক্সবাজার কেমন লাগছে।
শ্যামা : আমার সবসময়ই ভাল লাগে।
আশফাক : ও আগেও আসা হয়েছে নাকি?
বকুল ভাই শ্যামার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে-
বকুল : হ্যা হ্যা, এই বেড়াতে আসা হয়েছে বেশ কয়েকবার।
এর মধ্যে রিমা রাফিকে কোলে নিয়ে প্রবেশ করে। কফি নিয়ে বেয়রা চলে আসে।
শমিক : ভাবি কফি খাবেন?
রিমা বসতে বসতে-
রিমা : না ভাই কফি খেলে আমার ঘুম হয়না ঠিকমত।
সবাই হেসে উঠে।
রিমা : কি ব্যাপার সবাই হাসলো কেন?
বকুল : আমার দিকে তাকিয়ে আছ কেন, আমি কি করে জানবো?
রিমা : নিশ্চই তুমি আমার ঘুম নিয়ে কিছু বলেছ।
শ্যামা : আহ আপু আবার শুরু করলে।
সবাই হাসে, রিমাও হাসে, রাফিও হাসে। রিমা রাফিকে বলে-
রিমা : এই তুই কি বুঝে হাসলি।
সবাই আবার হেসে উঠে। হোটেলের লং শট।

দৃশ্য – ১১
উপজাতিয় নাচের একটা দৃশ্য। কিছু কোলাজ শট দিয়ে নাচটাকে ফুটিয়ে তোলা হবে। একপর্যায়ে দেখা যাবে শমিক, আশফাক সাহেব, শ্যামা, রিমা, রাফি, বকুল ভাই আরো কিছু মানুষ দর্শক সাড়িতে। সবাই মজা করে নাচ দেখছে। একসময় আশফাক সাহেব উঠে পড়েন। শ্যামা ছাড়া কেউ খেয়াল করেনা। আশফাক সাহেব একটু আড়ালে গিয়ে ইনহেলার নেন। তার শ্বাস কষ্ট হচ্ছিল। তিনি চুপচাপ বসে থাকেন। একটু পরে শ্যামা আসে।
শ্যামা : আপনার কি শরীর খারাপ।
আশফাক : বস মা।
শ্যামা বসে।
আশফাক : খুব খারাপ ছিল এখন একটু ভাল, ডাক্তার বললো চেঞ্জ করা দরকার, শমিক জোর করে নিয়ে এলো।
শ্যামা : শমিককে ডাকবো?
আশফাক : নাহ্, থাক মজা করে নাচ দেখছে, ঢাকায় তোমরা থাক কোথায়।
শ্যামা : কলাবাগানে।
আশফাক : ও, আমরা শুক্রাবাদে, এসো ঢাকা ফিরে।
শ্যামা : আসবো।
শমিকের প্রবেশ।
শমিক : বাবা আমাকে ডাকলে না যে, ইনহেলার নিয়েছ?
আশফাক : নিয়েছি।
শমিক : চল শুয়ে থাকবে।
আশফাক : থাকিনা একটু, ওর সঙ্গে কথা বলছি।
শ্যামা : আপনারা যান, আমি নিয়ে যাবো সঙ্গে করে।
শমিক : ঠিক আছে বাবা দেরী করোনা।
রিমা শ্যামাকে ডাকতে থাকে শ্যামা- তোমরা যাও আমি আসছি- বলে কিছুক্ষন চুপচাপ।
আশফাক : সমুদ্রের গর্জন শুনতে পাচ্ছ?
শ্যামা : পাচ্ছি।
আশফাক : একটা তাল আছে তাইনা?
শ্যামা : হু।
আশফাক : মানুষের জীবন যাপনেরও একটা তাল আছে।
শ্যামা জিজ্ঞাসু দৃস্টিতে তাকায়।
আশফাক : আমার তাল কেটে গেছে, আমার জীবনের সেতারের একটা তার ছিড়ে গেছে, তাই আমি এতটা অসুস্থ হয়ে পড়েছি।
শ্যামা তাকিয়ে থাকে।
আশফাক : শমিকের মা আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন।
শ্যামা : সরি।
আশফাক : না তিনি বেচে আছেন।
শ্যামা : তাহলে?
আশফাক : জীবনের এতটা বছর পার করে তার মনে হয়েছে, সে নিজের জন্য কিছূই করেনি, যা করেছে আমার আর শমিকের জন্য। এতদিন পরে তার মনে হয়েছে, তার নিজের জন্য কিছূ করা উচিৎ। সে স্বাধীন ভাবে বাচতে চায়, সংসারের জেলখানায় সে আর বন্দি থাকতে চায়না।
শ্যামা তাকিয়ে তাকে।
আশফাক : শমিককে আমি বলেছি তার মায়ের সঙ্গে যেতে, সে আমার সঙ্গে রয়ে গেছে।
শ্যামা : কেন?
আশফাক : তার বোধহয় জেলখানা পছন্দ (হেসে উঠেন)
শ্যামাও হাসে।
শ্যামা : এত কষ্টের মধ্যেও আপনি হাসেন?
আশফাক : আমরা যে মানুষ, আমাদের অনেকরকম ভান করা ছোটবেলা থেকে শেখানো হয়। চরম দুঃখে আমরা হাসি, অতি আনন্দে আমরা কাঁদি।
শ্যামা হাসে।
আশফাক : তোমাকে এতসব বলছি কেন জান?
শ্যামা জিজ্ঞাসু নয়নে তাকায়।
আশফাক : তোমাকে দেখেই আমার পছন্দ হয়েছে, অনেক বেশী বন্ধু মনে হয়েছে।
শ্যামা : এবার উঠুন, ডিনার সেরে শুয়ে পড়বেন তাড়াতাড়ি, ভোরে সূর্যোদয় দেখতে যাবো, আমার সাথে যাবেন নিশ্চই।
আশফাক : নিশ্চই নিশ্চই।
শ্যামা হাত ধরে আশফাক সাহেবকে উঠায়। রুমে পৌছে দেয়।

দৃশ্য – ১২
সময় দিন। হোটেলের লং শট। রিমার গলা শোনা যাচ্ছে, কাউেেক বকছে…
রিমা : তোমাকে না বলেছি আমাদের পিছু নেবেনা, বলিনি, ভাল হবেনা কিন্তু মিলু, তুমি যদি মনে করে থাক বার বার তুমি একই কাজ করবে আর আমরা তা মেনে নেব তাহলে ভুল করবে, প্লিজ তুমি চলে যাও, যাও বলছি।
একজন লোক হোটেলের বারান্দায় রিমার সঙ্গে কথা বলছে, তার পিঠ দেখা যাচ্ছে, ক্যামেরা লো এঙ্গেলে ধরা, ক্যামেরা এগিয়ে রিমার উপর ক্লোজ হতে হতে লোকটা ঘুরে চলে যাবে, লোকটার মুখ দেখা যাবেনা।
রিমা : এতবড় সাহস, কক্সবাজার এসে হাজির হয়েছে।

দৃশ্য – ১৩
শমিক আর শ্যামা হাটছে সৈকতে।
শ্যামা : আপনি আপনার বাবার সঙ্গে থেকে গেলেন কেন?
শমিক : মানে?
শ্যামা : না মানে আপনি তো আপনার মায়ের সঙ্গেও যেতে পারতেন।
শমিক : ওহ্, নিশ্চই বাবা..
দুজনে থামে।
শ্যামা : সরি আপনার পারসোনাল ব্যাপারে নাক গলানো ঠিক হচ্ছেনা বোধহয়।
শমিক : না তা বলছি না, আমার বাবা খুব দুর্বল চিত্তের মানুষ, নিজের একান্ত কষ্টের কথাগুলো যার তার সামনে বলে ফেলেন।
শ্যামা : ও আচ্ছা, আমি বুঝি যার তার?
শমিক : কি মুশকিল আমি তা বলছিনা।
শ্যামা : তাহলে কি বলছেন?
শমিক : আপনি না অনেক কথা প্যাচাতে পারেন।
শ্যামা : কি করবো আমিতো একটা মেয়ে।
শমিক : এটা ভাল বলেছেন, তবে এই যে আজকে চারদিন হলো আপনি কি আপনার সম্পর্কে একটা কথাও আমাকে বলেছেন?
শ্যামা : না তা বলিনি।
শমিক : তাহলে?
শ্যামা : হয়তো সময় হয়নি তাই।
শমিক : পড়াশুনা করছেন?
শ্যামা : নাহ্ অনার্স করার পর ব্রেক অফ স্টাডি হয়ে গেল।
শমিক : কেন?
শ্যামা : এমনি, পড়াশোনা অনেক ধৈর্য্যের ব্যাপার, আমার ধৈর্য্য কম।
শমিক : বিয়ে?
শ্যামা : আমি? আমাকে কে বিয়ে করবে?
শমিক : কি যে বলেননা, একেই বলে বিনয়ী সুন্দরী।
শ্যামা : বলেছে আপনাকে আমি সুন্দরী, সুন্দরী হলে এখন পর্যন্ত একটা বয়ফ্রেন্ড যোগার করতে পারলাম না।
শমিক : চেষ্টা করেছেন কখনো।
শ্যামা : ধুর বাদদিন, আমার দ্বারা এসব হবে টবেনা, আচ্ছা এবার বলুন কেন মায়ের সঙ্গে যাননি।
শমিক : এখানে যাওয়া না যাওয়ার প্রশ্ন আসছে কেন, আমি আসলে নিজের সঙ্গেই আছি, প্রতি সপ্তাহেই আম্মার সঙ্গে দেখা করি, প্রায়ই ফোনে কথা হয়, আমি মনে করি প্রত্যেকেরই জীবন সম্পর্কে আলাদা আলাদা দৃষ্টিভঙ্গি আছে, যে যার মত থাকতে চায়, থাকুক না।
শ্যামা : আপনি অনেক চালাক, খুব সহজে এড়িয়ে গেলেন।
শমিক : বাদ দেন তো।
শ্যামা : চলেন হাটি।
দুজনে উঠে দাড়ায়। এখনে কিছু কোলাজ শট দিয়ে একটা গানের চিত্রায়ন করা হবে। (১মিনিট)
গানের মাঝে মাঝেই মিলুকে দেখা যাবে তাদের ফলো করতে, কিন্তু মিলুর মুখ দেখা যাবে না।

দৃশ্য – ১৩
সময় রাত। হোটেলের লং শট। শ্যামা আর শমিক প্রবেশ করে, বারান্দায় রিমা দাড়িয়েছিল। কাছে আসতেই শ্যামাকে হাত ধরে টানতে টানতে ভেতরে নিয়ে যায়। শমিক আহত হয়ে তাকিয়ে থাকে। ভেতরে চিৎকার চেচামেচি চলতে থাকে। কিছু শোনা যায়, কিছু শোনা যায় না। শমিক একবার মনে করে দরজায় নক করবে, আবার কি মনে করে থেমে যায়। নিজের রুমে ঢুকে পড়ে।

দৃশ্য – ১৪
সময় রাত। কিছু মিউট শটে দেখা যাবে রিমা শ্যামাকে বকছে। একসময় বকুল ভাই এসে উপস্থিত হয়, উনি কিছু বুঝার চেষ্টা করেন। রিমা ক্রমাগত চিৎকার করতে থাকে, একসময় শ্যামা বিরক্ত হয়ে উঠে যায়। শ্যামা বারান্দায় এসে দাড়ায়, কাঁদতে থাকে। আবহে মিউজিক। হোটেলের লং শটে শ্যামা বারান্দায় দাড়িয়ে আছে। মিলু আড়াল থেকে দেখে শ্যামাকে। মিলুর মুখ দেখা যায় না (ব্যাকশটে দেখানো হবে)

দৃশ্য – ১৫
সূর্যোদয়ের শট। শমিক মুগ্ধ চোখে দেখছে। বকুল ভাই্ হন্তদন্ত হয়ে উপস্থিত।
বকুল : তুমি একা?
শমিক : হ্যা বাবা ঘুমাচ্ছেন, শরীরটা একটু খারাপ করেছে।
বকুল : না মানে শ্যামাকে দেখেছ?
শমিক : হোটেলে নেই?
বকুল : না ভোরে বেরিয়েছে আমরা মনে করলাম বোধহয় তোমার সাথে..
শমিক : আমার সাথে শেষ দেখা হয়েছে সন্ধ্যায়।
বকুল : ও..।
শমিক : বকুল ভাই আমি কি আপনাদের কোন সমস্যায় ফেলে দিয়েছি?
বকুল : নারে ভাই….।
শমিক : কাল শ্যামাকে বোধহয় অনেক বকাঝকা….।
বকুল : আর বোলোনা ভাই মেয়েটাকে নিয়ে আমরা বড় বিপদে আছি…, এই দেখনা ভোর থেকে লাপাত্তা। পরে তোমাকে সব বলবো, এখন যাই একটু খুজে দেখি, তুমি দেখলে বলো আমরা খুজছি।
বলেই বকুল ভাই হনহন করে চলে যান। শমিক একটু চিন্তিত হয়ে পড়ে। সেও হোটেলের দিকে এগোয়।

দৃশ্য – ১৬
হোটেলের লবি। রিমা রাফিকে কোলে করে পায়চারি করছে। বকুল ভাই্ প্রবেশ করে। রিমা চেচামেচি শুরু করে।
রিমা : কি পেয়েছ ওই ছেলেকে।
বকুল : না।
রিমা : খুজে বার কর, ওই লুকিয়ে রেখেছে।
বকুল : কি যে বলনা, ভদ্র একটা ছেলে।
রিমা : এসব ভদ্রতা আমার জানা আছে, তুমি পুলিশে ফোন কর, সব সুরসুর করে বের হয়ে আসবে।
বকুল : কি যে বলনা, থানা পুলিশ করে মান সম্মান যাবে। আগেরবারের কথা মনে নাই।
রিমা : ও সব দোষ মেয়েদের, ছেলেগুলো সব ধোয়া তুলসী পাতা, তুমি কিছু করবে কিনা বল, নাহলে আমাকেই করতে হবে।
বকুল : সন্ধ্যা পর্যন্ত দেখি।
রিমা : ও আচ্ছা, আমার বোনতো আমাকেই দেখতে হবে। ধর তোমার ছেলেকে, আমি যাচ্ছি।
রিমা রাফিকে বকুল ভাইয়ের কোলে দিয়ে শমিকের রুমের দিকে এগিয়ে যায়।

দৃশ্য – ১৭
রিমা শমিকের রুমে প্রবেশ করে। শমিকের বাবা শুয়ে ছিলেন।
রিমা : শমিক কোথায়?
আশফাক : বীচ এ বোধহয়।
রিমা : আপনার ছেলেকে সাবধান করে দেবেন, আমার বোনের দিকে যেন হাত না বাড়ায়।
আশফাক : এক্সকিউজ মি!
রিমা গটগট করে বেরিয়ে যায়।

দৃশ্য – ১৮
রিমা শমিকের রুম থেকে বের হয়ে বারান্দায় শমিকের সঙ্গে দেখা হয়।
রিমা : শ্যামা কোথায়?
শমিক : জ্বী?
রিমা : শ্যামাকে কোথায় লুকিয়ে রেখেছো?
শমিক : ভাবী চিৎকার করে সিন ক্রিয়েট করবেন না প্লিজ।
রিমা : সিন ক্রিয়েটের দেখেছো কি, ভালয় ভালয় স্বীকার কর নইলে….।
রিমা রাগে আর কথা বলতে পারেনা, নীচের লবির দিকে এগিয়ে যায়। শমিক হতবুদ্ধি হয়ে দাড়িয়ে থাকে।

দৃশ্য – ১৯
রিমা লবিতে এসে ফোন করে, এসময় বকুল ভাই রাফিকে কোলে নিয়ে পায়চারী করছিলেন।

দৃশ্য – ২০
সময় রাত। শমিকের রুমে শমিক টিভি দেখছিল, আশফাক সাহেব শুয়ে ছিলেন। দরজায় নক।
শমিক উঠে গিয়ে দরজা খুলে। পুলিশ দাড়িয়ে-
পুলিশ অফিঃ : শমিক আহমেদ।
শমিক : জ্বী!
পুলিশ : আপনাকে আমাদের সাথে থানায় যেতে হবে।
এর মধ্যে আশফাক সাহেব এসে শমিকের পাশে দাড়ায়।
শমিক : কেন?
পুলিশ : আপনার নামে কিডন্যাপের কমপ্লেইন আছে।
আশফাক : কি কমপ্লেইন।
পুলিশ : পাশের রুমের মিঃ বকুল তার শ্যালিকাকে কিডন্যাপের কমপ্লেইন করেছেন থানায়, আপনাকে আমাদের সঙ্গে থানায় যেতে হবে।
আশফাক : এটাকি মগের মুল্লুক নাকি কমপ্লেইন করলেই হলো?
পুলিশ : পুলিশের কাজে বাধা দেবেন না প্লিজ, উনি যদি ক্রাইম না করে থাকেন, টেনশন করারতো কিছু দেখছি না। প্লিজ চলুন, এটা হোটেল, আমি কোন ঝামেলা চাইনা।
শমিক : আমি কিছু কাপড় চোপড়…
পুলিশ : সে পরেও নেয়া যাবে।
শমিক এগিয়ে যায়, বকুল ভাইয়ের রুমের সামনে বকুল ভাই দাড়ানো, শমিক মুখভঙ্গি করে- কেন বকুল ভাই? বকুল ভাই বলার চেষ্টা করে – আমি না বিশ্বাস কর। আশফাক সাহেব এগিয়ে আসেন।
বকুল : আমার ওয়াইফ মাথা গরম করে…।
আশফাক : আমিতো কিছুই বুঝতে পারছি না।
হোটেলের লং শট। শমিককে নিয়ে পুলিশ বেরিয়ে যাচ্ছে।
ফেইড আউট।

দুইদিন পর।

দৃশ্য – ২১
শমিক সমুদ্রের পাড়ে দাাঁড়িয়ে আছে। মুখে দুইদিনের খোচা খোচা দাড়ি। সে ক্লান্ত। লং শটে হেটে আসেন বকুল ভাই । শমিকের পাশে দাড়ান। শমিক হাসে। বকুল ভাই বিব্রত। এক্সট্রিম লং শট বকুলভাই কথা বলছেন।
বকুল : শ্যামা বিয়ে করে প্রেম করে, পাচ বছর আগে বাড়ি থেকে পালিয়ে, পরিবারের সবার অমতে। তিন বছরের ছোট একটা বাচ্চা আছে ওর, বর কিছুই করতো না, রেন্ট এ কার এর ব্যবসা, দুটো গাড়ি ছিল। নেশা করতো, একসময় গাড়ি দুটো বেচে দিল। সব টাকা পয়সা নস্ট করে ফেললো, শ্যামা চাকরী করে সংসার চালাতো, অনেক কস্ট করেছে শ্যামা সংসারটা টিকিয়ে রাখতে, মাঝে একবার ও স্বামীর ঘর ছেড়ে চলে আসে, দু মাস ছিল, একদিন গভীর রাতে বাড়ি থেকে পালিয়ে স্বামীর কাছে চলে যায়। কেন জানিনা। ছয়মাস সে স্বামীর কাছে থেকে আবার ফিরে আসে অসুস্থ হয়ে। সুস্থ হয়ে প্রতিজ্ঞা করে সে আর কখনো স্বামী কাছে ফিরে যাবেনা, চাকরী বাকরী করে নিজের পায়ে দাড়াবে। কিন্তু দু মাস পরে আবার রাতের অন্ধকারে পালিয়ে স্বামীর কাছে চলে যায়। এবার যখন সে আসে শ্যামা খুবই মেন্টালী আপসেট ছিল, আমিই ওকে কক্সবাজারে নিয়ে আসার প্ল্যান করি, কারণ ওর হানিমুন হয়েছিল কক্সবাজারে, ওর খুব পছন্দের জায়গা কক্সবাজার, সুযোগ পেলেই ও আর ওর হাজবেন্ড চলে আসতো এখানে। এবার ওর হাজবেন্ড আমাদেরকে ফলো করে এখান পর্যন্ত শ্যামা এটা জানতো না, যখন জানতে পারে, তখন সে হোটেল থেকে ওর সঙ্গে পালিয়ে যায়। তোমার সঙ্গে শ্যামার একটা গুড রিলেশন ছিল বলে, রিমা মাথা গরম করে বিষয়টার সঙ্গে তোমাকে জড়িয়ে ফেলেছে। কালকে শ্যামা হোটেলে ফোন করে জানিয়েছে সে ভাল আছে, ঢাকায় ফিরেছে, স্বামী আর বাচ্চার সঙ্গে আছে।
শমিক বকুল ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে হাসে।
বকুল : আই এ্যাম সরি শমিক।
শমিক : কিন্তু সে কেন প্রতি বার এমন করে।
বকুল : জানিনা।
শমিক : সে পালিয়েই বা যায় কেন? আপনারা কি তাকে আটকে রাখেন?
বকুল : নাহ্।
শমিক : তাহলে?
বকুল : জানিনা, কিছুদিন পর পর চলে আসে, মনে করে আর ঘর সংসার করবেনা, আবার কি এক অমোঘ টানে ফিরে যায় স্বামীর কাছে, আর ওর হাজবেন্ডটাও, যখন শ্যামা চলে আসে সে জোকের মত লেগে থাকে, বাড়ির সামনে রাস্তায় দাড়িয়ে থাকবে, পাশের বাড়ির ছাদে উঠে উকি মারবে, ফোন করে করে হয়রান করে ফেলবে, বলবে – আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচবো না, তুমি ফিরে না আসলে আমি সুইসাইড করবো- এই সব, অদ্ভুত ফেরোসাশ ছেলে।
শমিক : আমার কি মনে হয় জানেন বকুল ভাই্, আমরা কেউ ওর ভেতরের কস্টটা বুঝতে চাই না, মে বি তারও ভেতরের অনেক গল্প থাকতে পারে। শুধু বাইরেরটা দেখে তো মানুষের সবটা জাজ করা যায়না।
বকুল : তোমাকে দু রাত জেল খাটালো, আর তুমি বলছো এই কথা?
শমিক : বলছি, কেন বলছি জানিনা।
বকুল : নারী জাতী বড়ই রহস্যময় ব্রাদার।
শমিক : রহস্যময়ী তো বটেই, মায়াময়ীও…।
বকুল ভাই অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকেন, শমিক এগিয়ে যেতে থাকে পানির দিকে, যেদিকে মায়াময় সমুদ্র আরও মোহনীয় হয়ে ধরা দিচ্ছে প্রকৃতির মাঝে। হাটু পানি পর্যন্ত গিয়ে শীমক থামে, আকাশের দিকে তাকায়, দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে মনে মনে বলে- পৃথিবীটা কি মিথ্যেয় ভরা, সত্যকে পাশে নিয়ে কোথাও কেউ কি নেই।
লং শটে শমিক পানিতে এগিয়ে যায়।
সমাপ্ত