নাটক : কুরবানী
রচনা : তাহের শিপন

কাহিনী সংক্ষেপ :
রাশেদ মাস্টার্স পাশ করে ভাল চাকরী করছে। তার বাবা আর সে মিলে ছোট্ট সুখের সংসার। তার একটাই মুদ্রা দোষ- মানুষের ঠিকানা জানতে চাওয়া। যখনই কারো সঙ্গে দেখা হয়, সে তার ঠিকানা জিজ্ঞেস করবে এবং লিখে রাখবে। তার এক বন্ধু আছে বল্টু, যে নিজেকে রাশেদ এবং অন্য যে করো চাইতে বুদ্ধিমান ভাবে। ঈদে রাশেদের বাবা রাশেদকে গরু কিনতে পাঠায়। রাশেদ তার বন্ধু বল্টুকে নেয় সঙ্গে। গরু কিনে আনার পর দেখা গেল গরুর বয়স কম। এই বয়সের গরু কোরবানী করা যায় না। রাশেদের বাবা বকাবকি করেন। রাশেদ বলে- চিন্তা নাই, সে গরু বিক্রেতার ঠিকানা লিখে এনেছে। রাশেদ গরু বিক্রেতার খোজে বেরিয়ে পড়ে। বিক্রেতার গ্রামে গিয়ে বিপদে পড়ে রাশেদ। কারণ সে যে গরু কিনেছে, সেটা আসলে চুরি করা গরু। ওই গ্রামেরই এক ছেলে চেয়ারম্যানের বাড়ির গরু চুরি করে হাটে নিয়ে বিক্রি করে দেয়। রাতে রাশেদ আর বল্টুকে আটকে রাখে। সকালে পুলিশ আসে, ঘটনাচক্রে পুলিশ অফিসারের পরিচিত রাশেদ । তখন আসল চোরকে খুজে বের করতে তৎপর হয় সবাই। চোর ধরা পড়ে। পুলিশ অফিসারের সহায়তায় রাশেদের বাবা আসেন গ্রামে। এসে চেয়ারম্যানের কন্যাকে রাশেদের জন্য পছন্দ করেন এবং তাদের বিয়ে দেবার মনস্থ করেন। চেয়ারম্যান রাশেদের বাবার জন্য কোরবানীর উপযুক্ত গরু খুজে বের করেন। ঈদের দিন কোরবানী হয়। বল্টু চিন্তায় পড়ে যায়- আসলে গরু কোরবানী হলো, নাকি রাশেদ কোরবানী হলো।

দৃশ্য – ১
রাশেদ সকাল বেলা নিজেদের ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে সিড়ি দিয়ে নামতে থাকে। দোতলার ভাড়াটিয়ার মেয়ের সঙ্গে দেখা। তার নাম ববি।
ববি : কেমন আছেন রাশেদ ভাইয়া।
রাশেদ : জ্বী ভাল আছি, আপনি কেমন আছেন?
ববি : ভাল, অফিস যাচ্ছেন?
রাশেদ : জ্বী।
রাশেদ নীচে নামতে গিয়ে পকেট থেকে নোটবুক বের করে-
রাশেদ : আপনি যেন কোথায় থাকেন? বাড়ির নাম্বারটা বলেনতো টুকে রাখি, পরে কাজে দেবে।
ববি : উফ মানুষ এত বেকুব হয়…।
ববি গটগট করে চলে যায়। রাশেদ তার গমন পথের দিকে তাকিয়ে থাকে।
রাশেদ : বেকুব বললো মনে হয়।
রাশেদ বেরিয়ে যায়।

দৃশ্য – ২
রাশেদ রিকশায় যাচ্ছিল। মোবাইল বাজে। রাশেদ নাম্বার দেখে চমকে উঠে কেটে দেয়। কিছুক্ষন পরে আবার মোবাইল বাজে। রাশেদ একই ভাবে কেটে দেয়। একটু পর আবার মোবাইল বাজে। এবার রাশেদ ধরে। ফোন করেছেন রাশেদের বাবা।
বাবা : ফোন ধরছিস না কেন?
রাশেদ : আব্বা আমি রিকশায়।
বাবা : রিকশায় কি ফোন ধরা যায় না?
রাশেদ : ধরা যায় আব্বা… কিছু শোনা যায় না।
বাবা : এখন শুনছিস কি করে?
রাশেদ : ঠিক বুঝতে পারছি না কি করে শোনা যাচ্ছে… তবে শোনা যাচ্ছে।
বাবা : আমার সঙ্গে চালাকী করবি না বুজছিস… আমি তোর বাপ… বুঝছিস।
রাশেদ : জ্বী সেটাতে সন্দেহ নাই।
বাবা : কি বললি?
রাশেদ : না ঠিক আছে বলুন আপনার জন্য কি করতে পারি।
বাবা : আজকে কয় তারিখ।
রাশেদ : (রাশেদ দ্রুত ডায়রী উল্টে) ফেব্রুয়ারী ১০, ২০০৫, ২০ শে পৌষ ১৪১১ বাংলা সাল, ১৪২৫ হিজরী ২২ জ্বীলহজ্জ।
বাবা : থাম থাম.. ঈদের আর কয়দিন বাকী।
রাশেদ : ছয়দিন।
বাবা : গরু কিনতে হবেনা?
রাশেদ : আমি গরুর কি বুঝি?
বাবা : আমার পায়ে ব্যাথা, হাটাচলা করতে পারিনা, তুই জানস না?
রাশেদ : তাই বলে আমি?
বাবা : হ্যা তুই, কালকেই বেরুবি, তোরতো গরু কিনতে মিনিমাম তিনদিন লাগবে।
রাশেদ : আচ্ছা দেখি।
বাবা : দেখাদেখির কিছু নাই.. অফিস থেকে ছুটি নে, কালকে সকালে গরু কিনতে বেরুবি বলে দিলাম।
বাবা ফোন কেটে দেয়। রাশেদের মুখ কালো হয়ে যায়। সে বল্টুকে ফোন করে।
কাট টু বল্টু মাথা নীচে পা উপরে দিয়ে ব্যায়াম করছিল, এই অবস্থায়ই ফোন আসে। বল্টু মাথার তলায় একটা কুশন দিয়ে ফোন ধরে।
রাশেদ : কি করিস।
বল্টু : এক্সারসাইজ করি।
রাশেদ : গলা এমন শোনাচ্ছে কেন?
বল্টু : উল্টা হয়া আছি।
রাশেদ : উল্টা হয়া আছি মানে?
বল্টু : এত কিছু বুইঝা কাম নাই, তর প্রবলেম ব্যাংকে নতুন কি প্রবলেম,রেডি হইছে সেইটা ক।
রাশেদ : গরু।
বল্টু : গরু? ব্যাংকের মইধ্যে গরু ঢুকলো কেমনে?
রাশেদ : আব্বা।
বল্টু : তোর আব্বা তোর ব্যাংকে গরু ঢুকিয়ে দিয়েছে?
রাশেদ : ফাজলামী করিস নাতো? কালকে সকালে বেরুতে হবে।
বল্টু : দোস্ত তোর বাপের প্রজেক্টে কাজ করতে চাই না, প্রত্যেকবার একটা ক্যাচাল হয়, সামনে ঈদ… একটা ফিচেলের মধ্যে পইড়া না যাই আবার।
রাশেদ : প্লিজ দোস্ত ৮:৪৫ এর মধ্যে চলে আসবি।
বল্টু : ৮:৪৫ এ কি?
রাশেদ : আব্বা ঘুম থেকে উঠে ৯টায় তার আগে বাইর হইতে হইবো, আমারে দেখলেই ঝাড়ি মারতে থাকে ।
বল্টু : তোর মইধ্যে মনে হয় কোন ম্যানুফ্যাক্চারিং ফল্ট আছে।
রাশেদ : এইসব কি কস দোস্ত ।
বল্টু : ঠিক আছে, ঠিক আছে আইমু ৮.৪৫ এ।
বল্টু ফোন রেখে আবার হাতে ভর করে দাড়ায়। দুইটা ডন মেরে উঠে দেখে নেয় চুল ঠিক আছে কিনা।
কাট্

দৃশ্য – ৩
বল্টু পাশের রুমে প্রবেশ করে। তার মা একবাটি ছোলা নিয়ে প্রবেশ করে।
মা : নে।
বল্টু ভেজানো কাঁচা ছোলা খায়।
মা : কাজ টাজ কিছু করবি নাকি বসে থাকবি।
বল্টু : কাজ আছে, রাশেদদের গরু কিনতে যেতে হবে।
মা : সেটাতো অন্যজনের কাজ, নিজের জন্য কিছু কর।
বল্টু : রাশেদতো নিজেদের লোকই।
মা : তোর কি বুদ্ধিশুদ্ধি কোনদিন হবেনা?
বল্টু : আমার বুদ্ধিশুদ্ধি ঠিকই আছে, তুমি বরং ডাক্তার দেখাও।
মা গটগট করে বেরিয়ে যায়। বল্টু আবার এক্সারসাইজ করতে থাকে।

দৃশ্য – ৪
পরদিন সকাল। রাশেদ তার রুমে পায়চারী করছে। আর ঘড়ি দেখছে। ঘড়িতে সকাল সাড়ে আটটা। সে একবার বারান্দায় যায় রাস্তায় উকি দেয়।

দৃশ্য – ৫
বল্টু তার ভাঙ্গা হোন্ডা করে রাশেদদের বাড়ির সামনে নামে। চুল ঠিক করে। তারপর বাড়ির ভেতর রওয়ানা হয়। দোতলায় উঠতে গিয়ে ববির সঙ্গে দেখা হয়।
ববি : কেমন আছেন বল্টু ভাইয়া।
বল্টু : ভাল।
ববি : এত সকালে! মিস্টার এড্রেস বুকের কাছে?
বল্টু : এড্রেস বুক?
ববি : রাশেদ ভাইয়া ।
বল্টু : এইসবের মানে কি?
ববি : ও জানেননা বুঝি, আপনার বন্ধুর কাছেতো পৃথীবির সব প্রানীর বাসার ঠিকানা আছে, আমার ধারনা প্রেসিডেন্ট বুশ থেকে শুরু করে রয়েল বেঙ্গল টাইগার সবার বাসার ঠিকানা উনার ডায়রীতে আছে, আপনারটা আছেতো?
বল্টু : আমারটা? আমারটা থাকবে কেন, যতসব আজগুবি।
বল্টু গজর গজর করতে করতে চলে যায়। ববি মুখ ভেঙ্গচে দরজা বন্ধ করে।

দৃশ্য – ৬
বল্টু রাশেদদের ফ্ল্যাটের সামনে দাড়িয়ে মোবাইলে ফোন করে। রাশেদ ফোন ধরে বলে-
রাশেদ : কই তুই?
বল্টু : দরজা খোল।
রাশেদ : দ দ দ রজা খুলবো মানে?
বল্টু : আমি তোদের ফ্ল্যাটের দরজায়।
রাশেদ : কলিং বেল না টিপে ফোন করেছিস কেন?
বল্টু : কলিং বেল টিপে রয়েল বেঙ্গলের লেজ দিয়ে কান চুলকাই আরকি! তোর যা বুদ্ধি।
রাশেদ : ও এটাতো ভেবে দেখিনি… আচ্ছা তুই দাড়া আমি বেরুচ্ছি।
বল্টু ফোন কেটে ওয়েট করতে থাকে। একটু পর রাশেদ খুব সন্তপর্নে দরজা খুলে বের হয়।
বল্টু : টাকা নিয়েছিস?
রাশেদ : এই যাহ টাকাইতো নেয়া হয়নি।
বল্টু : গরুর ব্যাপারীরা কি তোর শ্বশুর?
রাশেদ : যাহ আমিতো বিয়েই করিনি, শ্বশুর আসবে … আচ্ছা তুই দাড়া আমি টাকা নিয়ে আসি।
বল্টু : আমি নীচে আছি তুই আয়।
রাশেদ যেতে গিয়েও ঘুড়ে দাড়ায়। পকেট থেকে নোটবুক আর কলম বের করে।
রাশেদ : আচ্ছা বল্টু তোদের বাসার ঠিকানা যেন কি?
বল্টু চোখ পাকিয়ে তাকায়।
রাশেদ : বাড়ির নম্বরটা যেন কত?
বল্টু : আবার!
রাশেদ : আচ্ছা আ”চ্ছা ঠিক আছে লাগবেনা, তুই দাড়া আমি আসছি।
বল্টু নীচে গিয়ে দাড়ায়।

দৃশ্য – ৬
বল্টু নীচে দাড়িয়ে, একটু পর রাশেদ আসে।
রাশেদ : তোর এই ভাঙ্গা ভটভটিতে যেতে হবে?
বল্টু মনে হয় মাইন্ড করলো।
রাশেদ : মাইন্ড করছিস কেন.. গতমাসে একবার চড়েছিলাম তখনতো চলতে চলতে হেডলাইট খুলে পড়লো… এইবার চাকা খুলে পড়বে মনে হচ্ছে।
বল্টু চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকে। রাশেদ বল্টুর মাথায় হাত দিয়ে আদরের ভঙ্গিতে বলে-
রাশেদ : রাগ করছিস কেন?
বল্টু : খবরদার চুলে হাত দিবি না।
রাশেদ : ওহ্ সরি সরি তোর তো আবার…।
বল্টু : আমারতো আবার কি…? কি বলতে চাস তুই মিস্টার এড্রেস বুক?
রাশেদ : এড্রেস বুক? এইটা আবার কি?
বল্টু : গাধা।
রাশেদ : এই নামেতো আব্বা আমাকে ডাকে।
বল্টু : তুইনা চোখেও কম দেখিস, মাথাও বুদ্ধি কম, শুধু শরীরটা বড়, হোন্ডা নিয়ে গরুর হাটে যাব নাকি, এখানে রেখে যাব।
রাশেদ : ও তাহলে ঠিক আছে, এককাজ কর, কোন একটা কোনায় লুকিয়ে রাখ, আব্বার চোখে যেন না পড়ে, আব্বা যদি টের পায় তোকে নিয়ে গেছি।
বল্টু : আমাকে নিয়ে গেলে কি? কি বল? তোর সঙ্গে যে যাচ্ছি এটা তোর ফরটিনথ্ জেনারেশনের ভাগ্যি।
রাশেদ : রাগ করিসনা দোস্ত, তোর উপর আমার হান্ড্রেড পারসেন্ট আস্থা আছে, তোকে ছাড়া আমি কোন কাজটা করেছি বল, রাগ করিনা… চল চল।

দৃশ্য – ৭
রিকশার চাকা ক্লোজ কাট টু রিকশায় রাশেদ আর বল্টু রিকশায় যাচ্ছে। বল্টু গম্ভীর মুখে চুল ঠিক করছে।
বল্টু : কত টাকা এনেছিস?
রাশেদ : সাত হাজার টাকা।
বল্টু : কি!
রাশেদ : কেন? হবেনা?
বল্টু : সাতহাজার টাকায় গুরু! বাদ দে দশটা মুরগী কিনে বাসায় চলে যা।
রাশেদ : বলিস কি দশটা মুরগীর দাম সাত হাজার টাকা।
বল্টু : তাও জীবিত না মরা মুরগী।
রাশেদ : হে.. হে.. তুই জোক করছিস দোস্ত।
বল্টু : চোপ… জোক করছিস তুই….। সাত হাজার টাকা নিয়ে গরু কিনতে এসেছে, গরুর ব্যাপারীরা তোর শ্বশুর?
রাশেদ : কেন? তোর পরিচিত কেউ নেই?
বল্টু কটমট করে তাকায়।
রাশেদ : না মানে সব সেক্টরেইতো তোর কেউ না কেউ পরিচিত আছে.. তাই বলছিলাম…।
বল্টু : চোপ আর একটা কথাও না… চোপ।
রাশেদ ঢোক গিলে চুপচাপ বসে থাকে।

দৃশ্য – ৮
গাবতলী গরুর হাটের লংশট। রাশেদ আর বল্টু গরু কিনছে।

দৃশ্য – ৯
রাশেদের বাবা পায়চারী করছেন আর বিড়বিড় করছেন। কিছুক্ষন পর গেট খোলার শব্দ আর গরুর হাম্বা শুনে ঘর থেকে বের হন।

দৃশ্য – ১০
রাশেদদের বাড়ির নীচে বল্টু একটা গরুর দড়ি ধরে টানছে রাশেদ গরুর পেছনে দাড়িয়ে লম্ফ ঝম্ফ করছে, কিন্তু গরু নড়ছেই না। রাশেদের বাবার প্রবেশ।
বাবা : একি?
বল্টু সোজা হয়ে দাড়িয়ে চুল ঠিক করে, রাশেদ লাফালাফি থামিয়ে সামনে এগিয়ে আসে, গরুর দড়িটা বল্টুর হাত থেকে নিয়ে বাবার সামনে দাড়ায়। এই ফাঁকে বল্টু এককোনা থেকে হোন্ডা বের করে ঠেলতে ঠেলতে কেটে পড়ে।
রাশেদ : গরু পাওয়া গেছে আব্বা।
বাবা : এটা গরু? আমি মনে করেছিলাম…।
রাশেদ বিব্রত।
বাবা : দেখি…।
রাশেদের বাবা গরুর দাঁত দেখার চেষ্টা করে।
বাবা : কি যে খাওয়ায়।
রাশেদ : আজকে বোধহয় দাঁত ব্রাশ করেনি।
বাবা : হায় হায় এটা কি নিয়ে এসছিস?
রাশেদ : কেন আব্বা?
বাবা : এটাতো বাচ্চা গরু, কোরবানীর বয়স হয় নাই।
রাশেদ : দাঁত দেখে কেমনে বুঝলেন আব্বা?
বাবা : আরে গাধা- গরুর বয়স দাঁত দেখেই বুঝতে হয়।
রাশেদ : ইন্টারেস্টিং।
বাবা : এই গরুতো কোরবানী হবেনা… এখন কি করি।
রাশেদ : আব্বা চিন্তা করবেন না, চেঞ্জ করে আনবো।
বাবা : আরে গাধা এটা কি জামা জুতা যে চেঞ্জ করে দিবে, আর গরুর বেপারী বসে আছে তোর জন্য, সেতো এতক্ষনে ভেগেছে।
রাশেদ : অসুবিধা নেই আব্বা.. তার বাড়ির ঠিকানা নিয়ে এসেছি… একদম গ্রামের বাড়ির ঠিকানা, কাল সকালেই আমি গিয়ে তাকে খুজে বের করবো, খুব বেশী দুরে না গাজিপুর।
বাবা : তোর যা খুশী কর ঈদের আর দুইদিন বাকী.. কি হবে আল­াই জানে।
বাবা বেরিয়ে যায়। রাশেদ গরুটা বেধে বল্টুকে ফোন করে।
বল্টু : বল।
রাশেদ : পালিয়ে গেলি যে।
বল্টু : তোর রয়েল বেঙ্গল টাইগার তুই সামলা।
রাশেদ : একটা ঝামেলা হয়ে গেছে দোস্ত, আব্বা বলেছে গরুর বয়স কম, এত ছোট গরু নাকি কোরবানী হয় না।
বল্টু : সাতহাজার টাকায় যে বাছুর নিয়ে আসিনি এটাই বেশী। তোর কিপ্টা বাপকে বল এবার মুরগী কোরবানী দিতে।
রাশেদ : যাহ মুরগী কোরবানী জায়েজ নাকি।
বল্টু : কিপটাদের মুরগীর বাচ্চা পর্যন্ত জায়েজ।
রাশেদ : এককাজ কর ভোরবেলা চলে আয়, গরু বিক্রেতার বাড়ি চলে যাই, গরুটা চেঞ্জ করে আনি, দরকার হলে কিছু টাকা বেশী দেব।
বল্টু : এই বেশী টাকাটা আগে দিলে কি হতো।
রাশেদ : এটাতো দোস্ত আমার পকেট থেকে দেব।
বল্টু : তোর পকেট থেকে আজকে দিলি না কেন?
রাশেদ : আমি মনে করেছিলাম…।
বল্টু : ও বাপকা বেটা না…। পানিতে না পড়া পর্যন্ত পকেটে হাত দেবে না।
রাশেদ : চল দোস্ত সকাল সকাল, আর দুই দিন বাকী ঈদের।
বল্টু : এই গরু নিয়ে গাজিপুর যাবি কি করে?
রাশেদ : বাসে করে।
বল্টু : গরু নিয়ে বাসে উঠবি?
রাশেদ : হ্যা ছোট গরু, অসুবিধা হবেনা।
বল্টু : গাধা তুই গরু নিয়ে হাটবি আর আমি হোন্ডা করে যাব।
রাশেদ : ঠিক আছে দোস্ত তাই সই, তবু আয়।
কাট্

দৃশ্য – ১১
গরুর মুখের ক্লোজআপ- হেটে যাচ্ছে। লং শট রাশেদ গরু নিয়ে হেটে যাচ্ছে এয়ারপোর্ট রোড ধরে। তার সামনে সামনে বল্টু ধীরে হোন্ডা চালাচ্ছে।

দৃশ্য – ১২
হোতাপাড়ার কোন গ্রামের পথে রাশেদ আর বল্টুর প্রবেশ। দুজনেই হেটে।
বল্টু : আজকে কপালে খারাবি আছে।
রাশেদ : কেন দোস্ত?
বল্টু : দেখলি না আমার হোন্ডাটা রাস্তার মাঝখানে বিগড়ে গেল, যাওয়ার সময় গ্যারেজ থেকে নিয়ে যেতে হবে।
রাশেদ : তোর যা হোন্ডা … এরকম হতেই পারে।
বল্টু : বেশী মাতিস না… তোর গাধামীর জন্যই এই অবস্থা, যেদিন আমার হোন্ডা নষ্ট হয় তখন সব বিপদ একসঙ্গে আসে। আল­ায় জানে কি আছে কপালে।
হঠাৎ হৈহৈ শব্দ। রাশেদ বল্টুর পেছনে লুকায়।
একদল লোক এসে রাশেদ আর বল্টুকে গরু সহ ঘিরে ধরে। একজন বেটেমত লোক, মকবুল তার নাম সে বলে-
মকবুল : ওই রহমইত্যা এইডাইতো নাকি?
রহমইত্যা : হ ওস্তাদ এইডাই, আমাগো পালা গরু আমি চিনমুনা?
মকবুল : শালা গরু চোর… চল এই দুইডারে চেয়ারম্যান সাবের কাছে নিয়া চল।
বল্টু : এই যে ভাই আমরা চোর না।
রাশেদ : আমরাতো কোরবানীর গুরু….।
মকবুল : ওই চুরি কইরা কোরবানী দিতে চাও… চল শালা চল।
বল্টু : দেখেন ভাই আমরা ভদ্রলোকের ছেলে।
মকবুল : তাতো দেখতেই পাইতাছি, চুরির মাল সহ ধরা পরছে ভদ্রলোক… চল চল।
দুজনকে ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে যায় মকবুল এবং অন্যান্যরা।

দৃশ্য – ১৩
চেয়ারম্যান সাহেবের বাড়ির উঠান। চেয়ারম্যান সাহেবের মেয়ে রুনু আর ঝুনু একজন আরেকজনের উকুন তুলছিল। হৈচৈ শুনে উঠে দাড়ায়। মকবুল রাশেদ আর বল্টুকে গরুসহ হাজির করে। চেয়ারম্যান সাহেব বেরিয়ে আসেন।
মকবুল : পাইছি চাচাজান, লালিরে পাইছি।
চেয়ারম্যান : কই আমার লালি কই… হায় হায়রে শুকায়া গেছেগা।
মকবুল : চাচাজান, লালির চোরদুইডারেও ধরছি?
চেয়ারম্যান : চো! কই আমার বন্দুক কই।
চেয়ারম্যান ঘরে ঢুকে যায়, তার পিছু পিছু তার দুই মেয়ে তাকে থামাবার চেষ্টা করে পারেনা, তিনি বন্দুক নিয়ে ঘর থেকে বের হন। রাশেদ আর বল্টুকে লোকজন লাইন ধরে দাড় করায়। চেয়ারম্যান বন্দুক এইম করে। রাশেদের পা কাঁপতে থাকে। বল্টু চুল ঠিক করে। রাশেদ তার জামা ধরে টানে, সে হ্যান্ডস আপ হয়। এইসময় রুনু দৌড়ে আসে।
রুনু : আব্বা থামেন।
চেয়ারম্যান : বড়আম্মা আপনে এই মামলায় জড়ায়েন না।
মকবুল : ফুতুর হয়ে যাবেন বড়আম্মা, চাচাজানের মামলায় যে পড়ছে…!
চেয়ারম্যান : চোপ!
রুনু : এই মকবুল চোর কোথায় পাইছস, এরাতো মনে হয় ভদ্রলোক।
মকবুল : ভদ্রলোক আম্মা আমাগো গরু নিয়া পলাইবো কেন?
রাশেদ : আমরা পালাইনিতো আমরাতো এই গ্রামেই আসছিলাম।
রুনু : মানে?
রাশেদ তার পকেট থেকে এড্রেস বুক বের করে ঠিকানা দেখায়, সেখানে চেয়ারম্যান বাড়ির ঠিকানা লেখা।
রুনু : এই ঠিকানা আপনারে কে দিছে?
রাশেদ : গরু যার কাছ থেকে কিনেছি।
মকবুল : কিনছি মানে? চোরের মার বড় গলা!
রহমত তাকে কনুইয়ের গুতা দিয়ে বলে-
রহমত : চোরের বাবার..।
মকবুল : হ হ বাবা।
রুনু : খুইলা কন দেহি।
বল্টু : আমি বলছি।
রুনু : আপনি কে?
বল্টু : আমরা দুই বন্ধু… আমরা গরু কিনতে হাটে গিয়েছিলাম, গরু কিনে ফেরার পথে রাশেদ…।
রুনু : রাশেদ কেডায়?
বল্টু : রাশেদ!
রাশেদ হাত তুলে-
রাশেদ : ইয়েস স্যার।
বল্টু : রাশেদ গরু বিক্রেতার নাম ঠিকানা লিখে রাখে, গরু বাসায় নেয়ার পর দেখা গেল বয়স কম, কোরবানী হবেনা…।
চেয়ারম্যান : ওই মিয়া গরুর বেপারীর ঠিকানা কেউ লেইখা রাখে…. বোকা পাইছো আমাগোরে… ওই পিডা লাগা।
সবাই ঝাপিয়ে পড়ে দুজনের উপর, মোটামুটি ভর্তা বানিয়ে ফেলে।

দৃশ্য – ১৪
ক্যামেরা একটা চাল রাখার মটকা থেকে প্যান হলে দেখা যায় মোটামুটি বিব্ধস্ত অবস্থায় রাশেদ আর বিল্টুকে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে। দুজনের অবস্থা মোটমুটি দশাসই।
বল্টু : দোস্ত মোটামুটি জামাই আদর করেছেরে।
রাশেদ কু কু ধরনের শব্দ করে।
বল্টু : একবার বের হয়ে নেই দেখবি জামাই আদর কাকে বলে।
রাশেদ : বের হওয়ার সম্ভাবনা আছে বলেতো মনে হয় না।
বল্টু : আমি এর শেষ দেখে নেব।
রাশেদ : তার আগে আমরা শেষ হয়ে যাবনাতো।
বল্টু : আরে রাখ অত সোজা না।
রাশেদ : কি করে ম্যানেজ করবি এই গ্রামে তোর কোন আত্মীয়স্বজন আছে নাকি?
বল্টু কটমট করে তাকায়। রাশেদ কু কু ধরনের শব্দ করে চুপ মেরে যায়।

দৃশ্য – ১৫
সময় ওইদিন রাতে। রুনু-ঝুনুর ঘর। রুনু ঝুনুর মাথার উকুন মেরে দিচ্ছে।
রুনু : উকুনের ফ্যাক্টরী একটা।
ঝুনু : আমি উকুনের ফ্যাক্টরী হইলে… তুমি হইছো উকুন মারার মেশিন।
রুনু : এত মারি তারপরেও কই থিকা আসে, কতো?
ঝুনু : মনে হয় বাচ্চা দেয়।
রুনু : যাহ্ ফাজিল।
ঝুনু : আইচ্ছা আপু চোর দুইডা কি না খায়া থাকবো সারারাইত?
রুনু : হ ঠিকই কইছস… চল দেখি কি আছে।

দৃশ্য – ১৬
চেয়ারম্যানের শোবার ঘর। রুনু ঝুনু প্রবেশ করে।
রুনু : আব্বা।
চেয়ারম্যান : বলেন আম্মাজান।
রুনু : মানুষ দুইটাকি সারারাত না খায়া থাকবে?
চেয়ারম্যান : মানুষ?
ঝুনু : ওই যে চোর দুইটা।
চেয়ারম্যান : চোরের আবার খানাখাদ্য কি আম্মাজান।
রুনু : কি যে বলেন না আব্বা, জেলখানায়ও মানুষরে খাওন দেয়।
চেয়ারম্যান : এই ঝামেলা আবার কে করবে, আচ্ছা দেখি মকবুলরে বইলা।
রুনু : কাউরে বলা লাগবে না, আমি দেখতেছি।
রুনু ঝুনু বের হতে গিয়ে আবার ফিরে আসে।
রুনু : আব্বা তাড়াতাড়ি একটা বিহিত করেন, ভদ্রলোকের ছেলেপেলে আপনে গুদামে আটকাইয়া রাখবেন এইটা ঠিক না।
চেয়ারম্যান : ভদ্রলোক? চোর আবার ভদ্রলোক হইলো কেমনে আম্মাজান।
রুনু : এতদিন ধইরা আপনে এলাকার চেয়ারম্যান, কে ভাল ার কে চোর এইডা চিনেন না এহনো?
চেয়ারম্যান মাথা চুলকায়। রুনু ঝুনু চলে যায়।
চেয়ারম্যান : মানুষ লইয়া কারবার করি, মানুষ চিনলাম না?

দৃশ্য – ১৭
সময় রাত। গোলাঘর। বাইরে শব্দ শোনা যায়। রাশেদ মাথা উঠিয়ে- হেল্প হেল্প- বলে। রুনু আর ঝুনু প্রবেশ করে দুজনের জন্য খাবার নিয়ে।
ঝুনু : নেন খেয়ে নেন।
রুনু একটু দুরে বসে।
বল্টু : খাব কি করে হাত বাঁধাতো।
ঝুনু রুনুর দিকে তাকায়। রুনু অন্যদিকে তাকিয়ে থাকে। ঝুনু রুটি ছিড়ে মাংসের ঝোলে ভিজিয়ে বল্টুকে খাইয়ে দেয়। রাশেদ বোকার মত তাকিয়ে থাকে। কিছুক্ষন পর সহ্য করতে না পেরে বলে-
রাশেদ : আমি কি না খেয়ে থাকবো?
ঝুনু রুনুর দিকে তাকায়। রুনু হেসে ফেলে এগিয়ে আসে।
কাট্

দৃশ্য – ১৮
সকালের সূর্য ওঠার শট। চেয়ারম্যানের বাড়ির উঠান। পুলিশ অফিসার দাড়িয়ে আছেন।
পুলিশ : দুইটারে বাইর কর।
মকবুল ঘর থেকে রাশেদ আর বল্টু কে বের করে।
পুলিশ : রাশেদ!
রাশেদ চোখ পিটপিট করে বলে-
রাশেদ : কে?
পুলিশ : আমি… আফসার চাচা।
রাশেদ : ও চাচা কেমন আছেন?
আফসার : তুই এই লাইনে কবে থেকে?
রাশেদ : কোন লাইনে চাচা?
আফসার : গরু চুরি?
রাশেদ বিব্রত।
রাশেদ : হয়েছে কি চাচা…।
আফসার : কি হয়েছে সেত দেখতেই পাচ্ছি, তোমার মোবাইল নাই?
রাশেদ : আছেতো চাচা, পকেটে।
আফসার : মকবুল!
মকবুল রাশেদ পকেট থেকে মোবাইল বের করে।
মকবুল : বড় গ্যাং মনে হইতাছে স্যার, করে গরু চুরি- পকেটে মোবাইল।
আফসার : মকবুল!
মকবুল : জ্বী সার।
আফসার : মুখ বন্ধ।
মকবুল : জ্বী সার।
আফসার : ওদের বাঁধন খুলে দাও।
মকবুল দুজনের বাধন খুলে দেয়।
আফসার : তোমার আব্বাকে ফোন কর, আমি কথা বলবো।
রাশেদ ফোন ডায়াল করে আফসার সাহেবের হাতে দেয়। আফসার সাহেব ফোন হাতে নিয়ে একটু দুরে গিয়ে কথা বলেন। রাশেদ তার নোট বুক নিয়ে এগিয়ে যায়-
রাশেদ : আংকেল আপনার ঠিকানাটা যেন কি?
আফসার কটমট করে তাকান। কি মনে করে হেসে বলেন-
আফসার : তোমার ডায়রী খুজে দেখ- এর আগে একবার ঢাকায় তোমাদের বাসায় গিয়েছিলাম তখন আমার ঠিকানা নিয়েছ।
রাশেদ দ্রুত ডায়রীর পাতা উল্টে আফসারের ঠিকানা খুঁজে পায়।
রাশেদ : সরি আংকেল।
আফসার রাশেদের বাবার সঙ্গে কথা বলেন। রাশেদ সরে গিয়ে রুনু ঝুনুর পাশে দাড়ায়। রাশেদ রুনুকে বলে-
রাশেদ : আপনাদের বাড়ির নম্বরটা যেন কত।
রুনু : কেন গরুর বেপারীর কাছ থেইকা না নিলেন।
রাশেদ বিব্রত-
রাশেদ : ও হ্যাঁ সরি সরি।
রাশেদ এবার ঝুনুকে বলে-
রাশেদ : আপনার ঠিকানাটা?
ঝুনু কটমট করে তাকায়।
আফসার এগিয়ে আসেন।
আফসার : চেয়ারম্যান সাহেব, রাশেদ হচ্ছে আমার বন্ধুর ছেলে, ওর বাবা আসতেছে, ততক্ষন ও আপনার এখানে থাকুক, উনি আসলে আমাকে খবর দেবেন।
আফসার চলে যায়।
বল্টু : এই সেরেছে রয়েল বেঙ্গল আসছে।
রাশেদ : এখন কি হবে দোস্ত, চল পালিয়ে যাই।
ঝুনু : আব্বাজান এরা পালিয়ে যাওয়ার বুদ্ধি করতেছে।
চেয়ারম্যান : কি মকবুল… মকবুল…।
মকবুল : জ্বী চাচাজান?
চেয়ারম্যান : এই দুইটারে বান এক্ষনি, দরজায় পাহাড়া বসা, তাগোর গার্জিয়ান না আসা পর্যন্ত যেন কোত্থাও যাইতে না পারে।
মকবুল রাশেদ আর বল্টুকে ঠেলে গোলাঘরে নিয়ে যায়। বল্টু বলতে থাকে-
বল্টু : এই তোর জন্যে তোর জন্যে… কি দরকার ছিল…।

দৃশ্য – ১৯
লং শটে রাশেদের বাবা গ্রামের পথ ধরে হেটে আসছেন, তার হাতে ছড়ি। কিছূদুর এসে তিনি একজন গ্রামবাসীকে থানা কোথায় জিজ্ঞাসা করেন। লোকটি আঙ্গুল তুলে দেখিয়ে দেয়। তিনি সেই দিকে রওয়ানা হন।

দৃশ্য – ২০
থানার ভেতর আফসার সাহেব একজন চোরকে জিজ্ঞাসাবাদ করছিলেন।
আফসার : তোমারেতো এই এলাকায় আগে দেখি নাই।
চোর : আপনে নতুন আইছেন।
আফসার : হু, এই লাইনে কয়দিন।
চোর : সবাই জানে।
আফসার : কি?
চোর : আপনে ছাড়া এই এলাকায় আমারে সবাই চেনে।
আফসার : হু, এইবার ভুল লোকের হাতে পরছ, ঈদটা থানায় কর এইবার নাকি?
চোর : কত ঈদ আইলো, গেল।
এইসময় রাশেদের বাবা প্রবেশ করেন।
আফসার : আরে নাসের ভাই আসেন আসেন।
চোর : নতুন আপদ।
আফসার : চোপ্… সেন্ট্রি.. সেন্ট্রি.. এইটারে লকআপে ঢুকাও।
সেন্ট্রি এসে চোরকে লকআপে ঢুকায়।
নাসের : চল আফসার… কোথায় যেতে হবে চল।
আফসার : এইতো কাছেই, আপনি চিন্তা করবেন না নাসের ভাই আপনার ছেলের কোন অসম্মান হবেনা, আমি সব ব্যবস্থা করে এসেছি।
নাসের : এইসব ঝামেলা আর ভাল লাগেনা আফসার, বুড়ো হয়েছি কোথায় একটু আরাম করবো… তানা।
আফসার : চলেন যেতে যেতে কথা বলি, এই কাছেই, হেটেই যাওয়া যাবে।
দুজনে থানা কম্পাউন্ড থেকে বের হন।

দৃশ্য – ২১
চেয়ারম্যানের বাড়ির উঠান। ঝুনু কাপড় শুকাতে দিচ্ছিলো। আফসার আর নাসের সাহেবের প্রবেশ।
আফসার : কই চেয়ারম্যান সাহেব কৈ?
চেয়ারম্যান সাহেব লুঙ্গি গেঞ্জী পড়া পেট চুলকাতে চুলকাতে হাজির।
চেয়ারম্যান : কেডারে?
আফসার বিব্রত হয়ে নাসের সাহেবের দিকে তাকায়।
আফসার : কই চেয়ারম্যান সাহেব আমাদের অতিথি দুইজন কোথায?
চেয়ারম্যান : অতিথি!
আফসার : ওই ছেলেদুটো আর কি।
চেয়ারম্যান : ও গরু চোর দুইডার কথা কন?
আফসার বিব্রত হয়ে নাসের সাহেবের দিকে তাকায়।
আফসার : কোথায় রেখেছেন?
চেয়ারম্যান : কুথায় আবার, গোলাঘরে!

দৃশ্য – ২২
গোলাঘরের ভিতরে হাতবাঁধা অবস্থায় বল্টুকে নাস্তা খাওয়াচ্ছিল ঝুনু।
ঝুনু : আমি আব্বার সঙ্গে আপনার লিগা কথা কইছি।
বল্টু : কি কথা।
ঝুনু : কইছি আপনের মাথায় বুদ্ধি কম, কিন্তু লোক ভালা।
বল্টু : কি! আমার মাথায় বুদ্ধি কম?
ঝুনু : বেকুবের দোস্তের মাথা ভর্তি কি বুদ্ধি থাকবো- না গোবর।
বল্টু ঝিমানো রাশেদকে ধাক্কা দেয়-
বল্টু : এই বেকুব এই… তোর জন্যে… সব তোর জন্যে…।
রাশেদ : কিক্ক্… কি কি হয়েছে দোস্ত?
বল্টু : আমার ফরটিনথ্ জেনারেশনের কেউ আমাকে বেকুব বলে নাই, এমনকি তোর হাড়কেপ্পন বাপও আমাকে কোনদিন বেকুব বলে নাই, আজকে তোর জন্যে… শুধু তোর জন্যে হাটুর বয়সী একটা মেয়ের কাছ থেকে আমাকে…!
ঝুনু : কি?
রাশেদ : কি?
বল্টু : কি?
ঝুনু : বেকুব।
বলে ঝুনু বেরিয়ে যায়। আফসার আর নাসের সাহেব প্রবেশ করে।
রাশেদ : আব্বা আমি না আমি না… বল্টু.. বল্টু..।
বল্টু : চাচা আমি না আমি না… রাশেদ.. রাশেদ।
নাসের সাহেব বল্টুকে-
নাসের : তুমি চুপ কর বেকুব।
রাশেদ : বেকুব?
নাসের : তুই হচ্ছিস বড় বেকুব, এইটা হচ্ছে ছোট বেকুব।
সবাই চুপ।
নাসের আফসারকে-
নাসের : ভালই… সসম্মানে রেখেছ আমার ছেলেকে।
আফসার বিব্রত। নাসের গোলাঘর থেকে বের হন। সাথে আফসার।

দৃশ্য – ২৩
চেয়ারম্যানের বাড়ির উঠান। রুনু ঝুনু দাড়িয়ে। চেয়ারম্যান ঘরের বারান্দায় চেয়ারে বসে পেট চুলকাচ্ছে। নাসের আর আফসার গোলাঘর থেকে বের হয়। রুনু হায়াত সাহেবকে বলে-
রুনু : চাচা আসেন বসেন।
নাসের : না ঠিক আছে।
রুনু : আপনে সম্মানী মানুষ, আপনের ছেলেও লোক ভাল, সরল মানুষ, আমি দেইখাই বুঝছি। আপনে বসেন চাচা, আসেন।
নাসের : তুমি কে মা?
আফসার : চেয়ারম্যান সাহেবের বড় মেয়ে।
রুনু ঝপ করে সালাম করে নাসেরকে, ঝুনুও- নাসের চমকে উঠেন।
নাসের : সালাম করলা কেন মা?
রুনু : আপনে আমাদের মুরুব্বী না?
নাসের : আজকালতো মা সালামের চল উঠে গেছে, বেচে থাক মা।
রুনু লজ্জিত হয়ে-
রুনু : মকবুল মকবুল…
মকবুল দৌড়ে আসে।
মকুবুল : জ্বী বড় আম্মা?
রুনু : যাও উনাদের নিয়া আস।
মকবুল গোলাঘরের দিকে যায়।

দৃশ্য – ২৪
গোলাঘর। মকবুল প্রবেশ করে রাশেদ আর বল্টুর বাধন খুলে দেয়।
মকবুল : যান বাইরে যান, আইজকা মনে হয় হামান দিস্তার বেবস্থা হইছে, বড় আম্মায় আপনেগো লইয়া যাইতে কইছে।
রাশেদ : আমি যাবনা দোস্ত তুই যা।
বল্টু : মাথা খারাপ, দরকার হয় সারাজীবন গোলাঘর থেকে বাইর হমু না, তবু মেয়েমানুষের মাইর খাইতে রাজী না।
মকবুল : যাইবেন না মানে…. আপনেরা জানেন বড় আম্মার কথায় এই বাড়ির সব উঠে বসে, আমাগো চেয়ারম্যান সাহেবও… চলেন…।
মকবুল দুজনকে টানতে টানতে বাইরে নিয়ে যায়।

দৃশ্য – ২৫
উঠান। মকবুল দুইজনকে টানাটানি করছে বের করার জন্য, অর্ধেক ঘরের বের করে ফেলেছে এমন সময় রুনু হুংকার দেয়-
রুনু : এ্যাই, এইসব কি হইতাছে মকবুল, এরা ভদ্রলোকের ছেলে, গরুছাগল যে টানাটানি করতাছস, ছাইড়া দে।
মকবুল ছেড়ে দেয়।
রুনু : আসেন আপনেরা বাইরে আসেন।
রাশেদ আর বল্টু দৌড়ে গোলাঘরের ভেতরে ঢুকে যায়। রুনু গোলাঘরের সামনে গিয়ে দাড়ায়।
রুনু : বাইরে আসেন, বাইরে আসেন কইতাছি।
একটু পর বল্টু রাশেদকে সামনে দিয়ে সে পেছনে লুকিয়ে বাইরে এসে দাড়ায়। রুনু নাসেরকে বলে-
রুনু : চাচা আপনার ছেলে বুইঝা নেন।
চেয়ারম্যান : বিচার সালিশ ছাড়া একটা চোররে… এইভাবে।
রুনু : আব্বা আপনে চুপ করেন.. কে চোর আর কে ভালা মানুষ আপনে এখনও চিনলেন না। চাচাজীর দিকে তাকায়া দেখেন… তিনারে দেখে কি মনে হয় উনার ছেলে এই কাজ করতে পারে।
এমন সময় রহমইত্যা এসে চেয়ারম্যানের কানে কানে কি যেন বলে।
চেয়রম্যান : তাই নাকি, ওসি সাব শুনছেন নাকি আসল চোর ধরা পড়ছে, চলেনতো যাই দেখি, (নাসেরকে) ভাইজান আমি বড়ই শরমিন্দা আপনেরা বসেন, আমি আসতাছি, চলেন ওসি সাব।
আফসার, মকবুল আর চেয়ারম্যান বেরিয়ে যায়।
রুনু : চাচা আসেন বারান্দায় বসেন।
নাসের : নারে মা চলে যাই, কালকে ঈদ… গরু তো এখনও কেনা হলোনা।
রুনু : আপনে কোন চিন্তা কইরেন না, বসেন, সব হইবো।
সবাই বারান্দায় বসে।
রুনু : ঝুনু যাও সবার জন্য সরবত বানাও… রহমত হাতপাখা আন, চাচাজীরে বাতাস কর।
সবাই নাসের সাহেবকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

দৃশ্য – ২৬
লংশটে একজন চোরকে ধাক্কাতে ধাক্কাতে নিয়ে আসছে মকবুল। পেছন পেছন আসছেন চেয়ারম্যান, আফসার আরও অনেক লোকজন, সবাই প্রবেশ করে চেয়ারম্যান সাহেবের বাড়ি।

দৃশ্য – ২৭
চেয়ারম্যানের বাড়ির উঠান। সবাই চোরকে নিয়ে প্রবেশ করে। রাশেদ আর বল্টু নেমে আসে বারান্দা থেকে।
রাশেদ : আরে এইতো সেই গরুর ব্যাপারী যার কাছ থেকে আমরা গরুটা কিনেছিলাম।
বল্টু : এই ব্যাটাইতো… ধর ব্যাটাকে এইব্যাটার জন্যই এত ঝামেলা।
রাশেদ : এইযে ভাইজান আপনি বয়সকম এমন একটা গরু আমাদের কাছে বিক্রি করে আমাদের কি বিপদেই না ফেললেন। আর নিজের বাড়ির ঠিকানা না দিয়ে ভুল ঠিকানা দিলেন কেন?
চেয়ারম্যান : ও বুজছি আসল ঘটনা, আমার গরু চুরি কইরা হাটে বেইচা আবার আমার বাড়ির ঠিকানা তোমগোরে লেইখা দিছে এই শয়তানে।
রাশেদ : ও আচ্ছা গরু তাহলে আপনারনা? ভালতো অন্যের গরু নিজের বলে হাটে বিক্রি করা… ইন্টারেস্টিং বিজনেস!
আফসার : এই চল সবাই।
সবাই চোরকে নিয়ে চলে যায়।
চেয়ারম্যান এগিয়ে যায় নাসের সাহেবের দিকে।
চেয়ারম্যান : ভাইজান আপনাগোরে ভুল বুইঝা অনেক গুনাহ্র কাম করছি, বড়আম্মা না বললে আরও কত যে কষ্ট দিতাম আপনাগোরে।
নাসের : না না ঠিক আছে, আমরা তাহলে রওয়ানা হই, কালকে ঈদ… গরু কেনার ব্যাপারটাতো রয়েই গেল।
চেয়ারম্যান : গরু কেনার ব্যবস্থা আমি করতাছি, আপনে কোন চিন্তা কইরেন না, তবে ভাইজান সন্ধ্যা হয়া গেল কাইলকা ঈদ, আমাদের সঙ্গে ঈদটা কইরা যান।
নাসের : না না কি বলছেন, ঢাকায় আত্মীয় স্বজন- বন্ধু বান্ধব আছেনা।
চেয়ারম্যান : এইবারের ঈদে আমরাই আপনের বান্ধব।
রুনু : চাচাজান কালকের দিনটা শুধু… আমরা অনেক খুশী হব।
নাসের : কি মুশকিল! তুই কি বলিস রাশেদ।
রাশেদ : বল্টু যা বলে তাই হবে বাবা।
হায়াত : বল্টু বলবে কেন? তোর নিজের কোন সে নেই।
বল্টু : আমি এসবের মধ্যে নেই আংকেল, আমি এখনই চলে যাব, (ঝুনুকে) এই মেয়ে একটা চিরুনী নিয়ে আসতো।
নাসের : খবদ্দার একপাও নড়বানা এখান থেকে, কালকে কোরবানী হবে তারপর আমরা এখান থেকে যাব, চেয়ারম্যান সাহেব চলেন গরু কিনা নিয়া আসি।
চেয়ারম্যান : চলেন চলেন সেই ভাল। মা রুনু আমার টেকার পোটলাটা দাওতো।
হায়াত : টাকা নিয়ে এসেছি আমি চেয়ারম্যান সাহেব, চলেন… চলেন।
চেয়ারম্যান : চলেন চলেন… মকবুল আয় আয়।
চেয়ারম্যান, নাসের, মকবুল আর রহমত বেরিয়ে যায়।

দৃশ্য – ২৮
পরদিন সকাল। গ্রামের লংশট সবাই ঈদ উদযাপন করছে। গ্রাম্য মেলার কোন শট হলে ভাল হয়। গরু কোরবানী হয়ে গেছে। সবাই বারান্দায় বসে সেমাই খাচ্ছে। রুনু আর ঝুনু সবাইকে বেড়ে দিচ্ছে।
রাশেদ লাজুক মুখে সেমাই খাচ্ছে আর রুনুকে দেখছে। বল্টু পেছন ঘুরে মাথা আচড়াচ্ছে চিরুনী দিয়ে, আর ঝুনুর সঙ্গে চোখাচোখি হতেই চিরুনী লুকিয়ে ফেলছে। এমন সময় নাসের আর চেয়ারম্যানের প্রবেশ।
নাসের : আল­ার রহমতে গরু আমরা ভালই কিনছি কি বলেন চেয়ারম্যান সাহেব।
চেয়ারম্যান : মাশাল্লাহ বলেন… মাশাল্লাহাহ।
নাসের : মাশাল্লাহ্, আপনের মেয়েরা আমাদের যে যতœ আত্তি করলো।
চেয়রম্যান : আমার মা মরা মেয়ে ভাইসায়েব, ওরাইতো সংসারের হাল ধরে আছে।
নাসের : আপনারতো তাও সংসারের হাল ধরার একজন আছে, আমারতো তাও নাই, রাশেদের মা মারা যাওয়ার পর আমি নিজেই হাল ধরেছি।
চেয়ারম্যান : ছেলেরে বিয়া করান।
নাসের : এই ছেলেরে কোন মেয়ে বিয়ে করবে, এত কম বুদ্ধি নিয়া মানুষ কেমনে সংসার করবে?
চেয়ারম্যান : আপনার ছেলে না কইলেন বড় চাকরী করে।
নাসের : তা করে।
চেয়ারম্যান : কম বুদ্ধিআলা মানুস বড় চাকরী করতে পারে না ভাইসাহেব, ছেলেটা আসরে সরল।
নাসের : আপনের বড়মেয়েটারে আমার বড় পছন্দ হয়েছে ভাইসাহেব।
চেয়ারম্যান : জ্বী!
নাসের : এখন আপনি যদি আমার গাধা ছেলের হাতে আপনার মেয়েরে দিতে রাজী থাকেন…!
চেয়ারম্যান : আমরা গাও গেরামের মুখ্যসুখ্য মানুষ, আমার মাইয়া মাত্র কলেজ পাশ করলো, তারকি আপনাগো মত বড়লোকের ঘরে যাওয়ার কপাল হইবো?
নাসের : বড়লোক গরীব বুঝিনা, আমার ভাল লোক চাই, কি বলিস রাশেদ।
রাশেদ : আব্বা বল্টুকে একটু.. জিজ্ঞেস… (কথা গিলে ফেলে)
বল্টু : আমি আংকেল এইসবের মধ্যে নাই।
নাসের : কথা পাক্কা আপনার মেয়েরে আমি নিলাম।
চেয়ারম্যান : আইজকা তো আমার খুশীর দিন, কই মকবুল মিষ্টি আন, এই নে টাকা নে।
মকবুল : ঈদের দিন…মিষ্টির দোকান বন্ধ।
চেয়ারম্যান : দোকান খুলবি, দরকার হয় মিষ্টি বানায়া আনবি, আমার কথা কবি গিয়া ময়রারে।
মকবুল চলে যায়।
চেয়ারম্যান : বড় আম্মা, ভাইসাবেরে সালাম করেন।
রুনু এসে নাসের সাহেবকে সালাম করে। নাসের সাহেব তাকে দোয়া করেন। পেছনে বসা বল্টু রাশেদকে বলে-
বল্টু : দোস্ত গরু কোরবানী দিতে আইসা কোরবানী হইলি তুই… এইডা বুঝছসতো?
রাশেদ : বলিসকি দোস্ত তাই নাকি?
ঝুনু : (চোখ পাকিয়ে কোমরে হাত দিয়ে) কি?
ফ্রিজ