নাটক : একা একা
রচনা: তাহের শিপন

দৃশ্য ঃ ১
সময় সকাল। নাস্তার টেবিলে দিলু ,ফুপু নাস্তা করছে।
দিলু ঃ শ্যামা ওঠেনি।
ফুপু ঃ উঠেছে, আসছে।
দিলু ঃ এত সকালে তো কখনই উঠেনি।
ফুপু ঃ বৃহস্পতিবার সকালেই উঠে।
দিলু ঃ বৃহস্পতিবার কি?
ফুপু ঃ এমন ভাব করছেন জানেন না।
দিলু ঃ এমনবাবে কথা বলছেন কেন?
ফুপু ঃ কেমনভাবে বলছি?
দিলু ঃ পর পর লাগছে।
ফুপু ঃ আমরাতো তোর পরই, শ্যামাকে ছাড়া তুই আর কাউকে আপন ভাবিস।
দিলু ঃ কি যে বলেন, আপনিইতো আমার ভাঙ্গা সংসারের হাল ধরে আছেন। শ্যামার মা চলে যাবার
পর শ্যামাকে এই ছোট থেকে বড় করেছেন, আমার জন্যও কি কম করেছেন। আমরা বাপ বেটি আসলেতো আপনারই ছেলে-মেয়ে।
ফুপু ঃ সেটা তোর মেয়ে মানছে কই, আগে তাও দু’একটা কথা বললে শুনতো। এখন কোথায় যায় কি
করে বললে মুখ ঝামটা সইতে হয়।
দিলু ঃ বৃহস্পতিবার কোথায় যায়।
ফুপু ঃ আবার কোথায়? সেই ছেলেটার সঙ্গে দেখা করতে। বৃহস্পতিবার হাফবেলা অফিস, মেয়ের
সকাল থেকে সাজ সাজ রব।
দিলু ঃ আপনি কিছু বলেন না?
ফুপু ঃ বলেছি, অনেকবার বলেছি। এই বয়সে ওই বাচ্চা মেয়ের কাছে আর ছোট হতে বলবি না।
দিলু ঃ আমাকে আগে বলেননি কেন?
ফুপু ঃ অনেকবার বলার চেষ্টা করেছি। তুইতো বাইরে বাঘ, মেয়ে সামনে আসলে——
(শ্যামার প্রবেশ)
শ্যামা ঃ ফুপু ——– তাড়াতাড়ি নাস্তা দাও।
দিলু ঃ এত তাড়াহুড়া কিসের।
শ্যামা ঃ তোমার সঙ্গে বেরুবো।
দিলু ঃ আমার সঙ্গে কোথায় যাবি?
শ্যামা ঃ বড় চাচীর ওখানে।
দিলু ঃ তারপর——
শ্যামা ঃ তারপর মানে——-
দিলু ঃ তারপর কোথায় যাবি। সেটাই জানতে চাচ্ছি।
শ্যামা ঃ মানে
দিলু ঃ দ্যাখ শ্যামা তুই কোথায় যাস কি করিস আমি সব খবর রাখি। কিছুই বলি না। তার মানে এই
নয় আমি সব মেনে নিয়েছি।
শ্যামা ঃ আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।
ফুপু ঃ তুই খুব ভালো করেই জানিস, সাঈদের সঙ্গে সম্পর্কের কথা আমরা সকলেই জানি—
(শ্যামা দাড়িয়ে যায়)
শ্যামা ঃ জানোই যদি, কেন তবে অযথা প্রশ্ন করছ?
দিলু ঃ অযথা—-?
শ্যামা ঃ আমি এখন বড় হয়েছি, আমার ভালমন্দ বোঝার বয়স এখন হয়েছে, আমাকে——
দিলু ঃ কত বড় হয়েছ তুমি, একটার পর একটা অন্যায় করে যাবে, আর আমরা তা মেনে নেবো।
কাট্

দৃশ্য ঃ ২
একটা ফাস্টফুডের দোকানে শ্যামা আর সাঈদ বসা, সামনে কিছু খাবার।
সাঈদ ঃ কি ব্যাপার, শ্যামার মন খারাপ কেন? এই বার্গারটা খাও!
শ্যামা ঃ উফ! বিরক্ত করোনাতো।
সাঈদ ঃ আজকে এতো বিরক্ত হচ্ছ কেন বলতো? সারা সপ্তাহ অফিস করে এই বৃহস্পতিবার তোমার
সঙ্গে একটা দিন দেখা হয়, এরপরেও যদি বিরক্ত হও—–
শ্যামা ঃ প্লিজ তুমি কিছু মনে করোনা, আজকে সকাল বেলাতেই বাবা মেজাজ খারাপ করে দিলো——
সাঈদ ঃ কেন কি হলো আবার!
শ্যামা ঃ আসলে তোমার সঙ্গে আমার সম্পর্কটা বাবা মেনে নিতে পারছে না।
সাঈদ ঃ আমি কি দোষ করলাম?
শ্যামা ঃ আমার এ্যাফেয়ার বাবা সহ্যই করতে পারেন না।
সাঈদ ঃ কিন্তু তুমিতো বলেছ তোমার বাবা তোমার মাকে বিয়ে করেছিলো প্রেম করে।
শ্যামা ঃ সেজন্যেই হয়তো। তুমিতো জানো আমার মা আমাদের ছেড়ে চলে গেছে।
সাঈদ ঃ তারমানে এই নয় তুমিও এমন করবে, তুমি আর তোমার মা সম্পূর্ন আলাদা দুজন মানুষ।
শ্যামা ঃ কি জানি বাবা, বুঝিনা, তবে শুনেছি আম গাছে আমই হয়– আর কাঠাল গাছে কাঠাল।
সাঈদ ঃ তুমি আম না কাঠাল, হা—হা—হা—-
কাট্

দৃশ্য ঃ ৩
(বিভিন্ন শটে দেখা যাবে সাঈদ / শ্যামার ঘুরে বেড়াবার দৃশ্য, গল্প করছে, খুব উচ্ছল দুটি প্রাণ। হোন্ডায় সাঈদ-শ্যামা, হঠাৎ একজন যুবককে ক্রস করে যুবকের হাতে ক্যামেরা, যুবক অবাক হয়ে দুজনকে দেখে, যুবকের মুখে জুম ইন, ফ্রিজ)
(যুবকটির নাম শমীক)
টাইটেলসমূহ শমীকের ফ্রিজ শটের উপর।

দৃশ্য ঃ ৪
(সাঈদ শ্যামাকে হোন্ডা করে শ্যামাদের বাড়িতে নামায়)
শ্যামা ঃ আসো ভেতরে আসো।
সাঈদ ঃ থাক শ্যামা, তোমার বাবা থাকতে পারে।
শ্যামা ঃ থাকতে পারে না। আছে, বৃহস্পতিবার বাবা বাড়ির বাইরে যায় না। জানো বৃহস্পতিবার
আমাদের ফ্যামিলির জন্য বিশাল একটা ব্যাপার, আমার বাবার জন্মদিন ছিল বৃহস্পতিবার, আমার বাবা বিয়ে করেছিলো তার জন্মদিনে।
সাঈদ ঃ মজারতো।
শ্যামা ঃ শোনো না, আমার যেদিন জন্ম হয় ৬ই জুন সেদিনও ছিল বৃহস্পতিবার, কি মজার তাই না,
আরও মজার শুনবে— আমার মাও বৃহস্পতিবার দিনই আমাদের ছেড়ে চলে যান, বিয়ে করেন আমার বাবারই এক বন্ধুকে—
সাঈদ ঃ আই এ্যাম সরি শ্যামা।
শ্যামা ঃ আমার জীবনে আরেকটা অদ্ভুত বৃহস্পতিবার আছে।
সাঈদ ঃ কি সেটা?
শ্যামা ঃ এই মিয়া, সব ঘটনা জানতে চাইছ যে, এখনও তোমার বউ হইনি মশাই।
সাঈদ ঃ সরি– সরি-।
শ্যামা ঃ চল, ভেতরে চল।
কাট্

দৃশ্য ঃ ৫
(ড্রইংরুম। দিলু বসে। শ্যামা, সাঈদকে নিয়ে প্রবেশ করে)
শ্যামা ঃ বাবা এ হচ্ছে সাঈদ, সাঈদ ইনি আমার বাবা।
সাঈদ ঃ ¯øামালেকুম।
দিলু ঃ (মাথা নেড়ে) বস, আমার শরীরটা ভাল না আমি একটু শুয়ে থাকবো।
(দিলু বেরুতে গিয়ে ডাইনিং এ ফুপুর সঙ্গে দেখা )
ফুপু ঃ সাঈদ এসেছে——
দিলু ঃ হ্যাঁ।
ফুপু ঃ শেষ পর্যন্ত ছেলেটাকে বাসায় নিয়ে এলো।
দিলু ঃ থাক, এনিয়ে কথা বলতে ইচ্ছা করছে না।
ফেড আউট ইন বø্যাক

দৃশ্য ঃ ৬
(সময় রাত। শ্যামা বেডরুমে বসে ছবির এলবাম দেখছে, তার নিজেরই নানান ভঙ্গিমার ছবি, শ্যামা গান শুনছে, দিলু পাশে এসে দাড়ায়, শ্যামা বুঝতে পারেনা, দিলু দেখছে শ্যামার ছবি দেখা, একটা ছবিতে জুম ইন)
কাট্

দৃশ্য ঃ ৭
(সময় পরদিন সকাল, দিলু বেসিনের আয়নার সামনে শেভ করার জন্য গালে ক্রিম ঘষছে, হঠাৎ শ্যামা বেডরুম এর দরজা ধরে চিৎকার)
শ্যামা ঃ বাবা —–
দিলু ঃ কি হলো—– কি হলো শ্যামা,
(শ্যামা জ্ঞান হারায়)

দৃশ্য ঃ ৮
সময় সকাল। হাসপাতালের দৃশ্য। শ্যামাকে ট্রলিতে করে নিয়ে যাচ্ছে, পাশে দিলু, ফুপু, শ্যামাকে ডাক্তার পরীক্ষা করছে, হাসপাতালের কয়েন বক্স থেকে দিলু কাকে যেন ফোন করার চেষ্টা করে। ফুপুর চিন্তিত মুখ, শ্যামার মুখ, ডাক্তার বেড়িয়ে আসে, মাথা নাড়ে, ফুপু ধপ করে বেঞ্চির উপর বসে, দিলু এগিয়ে আসে, সাঈদ আসে, সবাই চিন্তিত, আবার ডাক্তার আসে, দিলুকে একটা এক্সরে প্লেট দেখায়, হাসপাতালের বেডে শ্যামা, একটু সুস্থ, ফুপু তাকে কিছু খাওয়াচ্ছেন, (সব কিছুই সাইলেন্ট শট) দিলু রিক্সা করে যাচ্ছেন, চিন্তিত, সাঈদ হাসপাতালে শ্যামার পাশে বসে, কথা বলে, সাঈদের ক্লোজ আপ, চিন্তিত, শ্যামার ক্লোজ আপ, চিন্তিত, স্যালাইন চলছে, স্যালাইন বোতলের ক্লোজ শট্, ক্যালেন্ডারের পাতায় দিন চলে যাচ্ছে, একদিন, দুদিন, তিনদিন, দিলু আসে, শ্যামার বেডের পাশ থেকে ফুপুকে ডেকে নিয়ে যায়।

দৃশ্য ঃ ৯
(হাসপাতালের বারান্দায় দিলু আর ফুপু । রাত)
ফুপু ঃ কিছু হলো।
দিলু ঃ না।
ফুপু ঃ ডাক্তার কি বলেছে, দুটোই—–?
দিলু ঃ হ্যা, দুটোই,
ফুপু ঃ কোন উপায় নেই।
দিলু ঃ চেঞ্জ করা ছাড়া…।
ফুপু ঃ এতো অনেক টাকার ব্যাপার।
দিলু ঃ হ্যাঁ।
(ডাক্তার এসে দিলু আর ফুপুকে ডেকে নিয়ে যায়)

দৃশ্য ঃ ১০
(ডাক্তারের রুম। ফুপু এবং দিলুর সঙ্গে ডাক্তার ঢুকেন)
ডাক্তার ঃ দেরী করা যাবে না , আপনার হাতে মাত্র তিন দিন সময়, যা করার এর মধ্যে করতে হবে।
দিলু ঃ জানি, চেষ্টা করছি।
ফুপু ঃ দুটোই।
ডাক্তার ঃ না, একটা রিপ্লেস করলেও চলবে, একটা নিয়েও মানুষ বেঁচে থাকতে পারে। নিজেরা আতœীয় স্বজনের মধ্যে হলে ভাল, লিগ্যাল, তবে গ্রুপ ম্যাচিং এর একটা ব্যাপার আছে। আপনারা আগে নিজেদের মধ্যে চেষ্টা করেন। ওর সঙ্গে সেম বøাড গ্রুপের যারা আছে তাদেরটাই পরীক্ষা করতে হবে।
দিলু ঃ আমাদের কারো সঙ্গেই শ্যামার ব্লাডগ্রুপের মিল নেই।
ডাক্তার ঃ কি করবেন?
দিলু ঃ এতোগুলো টাকার ব্যাপার। আতœীয়-স্বজন সবার কাছেই গিয়েছি, বিপদের সময় সবাই হাত
গুটিয়ে নেয়।
ফুপু ঃ তাহলে এখন কি করবি?
দিলু ঃ এই মেয়ে ছাড়া তো আমার আর কেউ নেই, এত খারাপ লাগছে, এই বিশাল পৃথিবীতে এত
অসহায় লাগছে নিজেকে।

দৃশ্য ঃ ১১
(শমীক ডার্করুমে কাজ করছে আর কর্ডলেস টেলিফোনে কথা বলছে)
শমীক ঃ থ্যাঙ্ক ইউ শাহেদ ভাই, হ্যা টাকা পেয়েছি, হ্যা না না যথেষ্ট। জ্বী, জ্বী—-আসবো, হ্যা—-হ্যা একটু ব্যস্ত, আপনি আসেন না একদিন—-
(ফুপুু নক করে)
শাহেদ ভাই রাখি, কেউ এসেছে মনে হয়।
(শমীক টেলিফোন রেখে দরজা খুলে রেব হয়)
শমীক ঃ ¯øামালেকুম, ফুপু আপনি?
ফুপু ঃ হ্যাঁ আমি, খুব অবাক হয়েছ না।
শমীক ঃ অবাক হয়েছি মানে, ভীষন অবাক হয়েছি। খুঁজে পেতে কষ্ট হয়নিতো ।
ফুপু ঃ নাহ্, দরকার যখন প্রকট হয়, তখন কষ্ট হয়না।
শমীক ঃ জানি, কোন কারন ছাড়া আমার এখানে আপনি আসেননি। কেমন আছেন।
ফুপু ঃ শ্যামার কথা জানতে চাইলে না যে।
শমীক ঃ শ্যামা অসুস্থ।
ফুপু ঃ তুমি জানো?
শমীক ঃ হ্যা, দিলু চাচার সঙ্গে কয়েকদিন আগে দেখা হয়েছিলো,
ফুপু ঃ জেনেও একবার দেখতে গেলে না।
শমীক ঃ গিয়েছিলাম একদিন, দরজার বাইরে থেকে ফিরে এসেছি।
ফুপু ঃ কেন?
শমীক ঃ কেন? যে উৎকন্ঠা নিয়ে আমি ছুটে গিয়েছিলাম, হঠাৎ মনে হলো কি লাভ?— আসলে কি
জানেন মানুষ হয়ে জন্মাবার মূল অসুবিধা হলো, আমরা যখন যা ইচ্ছে করি তা করতে পারি না..
(ফুপু নিশ্চুপ, দীর্ঘশ্বাস)
শমীক ঃ পাওয়া গেছে———-
ফুপু ঃ সব চেষ্টা শেষ, এখন তোমার কাছে এসেছি।
শমীক ঃ জ্বী——?
ফুপু ঃ পত্রিকায় একটা বিজ্ঞাপন দিতে চাই, যদি কোন ডোনার পাওয়া যায়, তোমার অনেক
জানাশোনা।
শমীক ঃ ঠিক আছে, আপনি বলুন আমি লিখে নিচ্ছি।
ফুপু ঃ সব তো তুমি জানই।
শমীক ঃ বাড়ির ঠিকানা।
ফুপু ঃ তুমি ভালো করেই জানো।
শমীক ঃ ও আগের বাড়িতেই আছেন, আচ্ছা। টেলিফোন নম্বর? আগেরটাই!
ফুপু ঃ ওর কাগজ পত্র গুলো দিয়ে যাবো।
শমীক ঃ আচ্ছা দিন! ও ভালো কথা বøাড গ্রুপ।
ফুপু ঃ সেটাও তুমি ভাল করেই জান।
শমীক ঃ ও নেগেটিভ!
কাট্

দৃশ্য ঃ ১২
(শমীকের বাসা, শমীক অফিস যাবার জন্য তৈরী হচ্ছে)
শমীক ঃ লুনা, দেরী হয়ে যাচ্ছে ভাই—-
(রানার প্রবেশ)
রানা ঃ এত সকালে কোথায় যাচ্ছিস।
শমীক ঃ তোকে বলা যাবে না।
রানা ঃ আমি তোর বন্ধু, আমাকে বলবিনা তো বলবি কাকে, লুনার কাছে সব শুনেছি, তুই আমাকে
আগে বললিনা কেন, আমি বাধা দেব বলে।
শমীক ঃ তোর বউকে তোর চাইতে ম্যাচিউরড মনে হয়,
রানা ঃ ম্যাচিউরড মানে, তোর একটা কিডনী হাইজ্যাক হয়ে যাচ্ছে—।
শমীক ঃ পুলিশি ভাষায় কথা বলিসনা তো, হাইজ্যাক হচ্ছে না, আমি নিজেই দিচ্ছি।
রানা ঃ তার মানে দান প্রকল্প, লুনা—- লুনা—–।
(লুনা নাস্তা নিয়ে আসে)
রানা ঃ শুনেছ, শমীকের কিছু কিডনী বেশী হয়ে গেছে রাখতে পারছে না, দান করে দিচ্ছে, তোমার
দরকার থাকলে নিতে পারো, আমিও কয়েকটা নিয়ে রাখবো ভাবছি। কখন দরকার হয় বলাতো যায় না।
শমীক ঃ খুব খেপেছিস মনে হচ্ছে।
রানা ঃ না ক্ষেপব কেন, আমরা তোর কে?
শমীক ঃ কি যে বলিস, তুই ছাড়া আমার আর কোন বন্ধু আছে বল। সেদিন যদি হল থেকে আমাকে
তোর এখানে না নিয়ে আসতি, আমি বাঁচতাম নারে।
লুনা ঃ শমীক ভাই, আপনার ফোন এসেছিলো, আপনি তখন জগিংএ।
শমীক ঃ এত ভোরে কে ফোন করলো।
লুনা ঃ বললেন শ্যামার ফুপু ।
রানা ঃ দোস্ত বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে।
শমীক ঃ কি বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে।
রানা ঃ তুই ফট করে সেন্টিমেন্টাল হয়ে কাজটা করিস না, তোর সারা জীবনের প্রশ্ন।
শমীক ঃ আমি জানি।
রানা ঃ তুই কিছুই জানিসনা, গত পাঁচ বছরে ও বাড়ির কেউ ফোন করেছে তোকে।
শমীক ঃ ওদের বাসায় ফোন নেই।
রানা ঃ এখনও নেই, তবু ফোন করছে, কেন করছে জানিস নিজেদের স্বার্থে।
শমীক ঃ কেন শুধু শুধু বাজে কথা বলছিস।
রানা ঃ বাজে কথা বলছি, শ্যামা যখন তোকে ফেলে চলে গেল, তখন ওরা কোন খোঁজ নিয়েছিলো,
একটা দিন জিজ্ঞেস করেছিলো তোকে কেন শ্যামা এমন করলো, তুই কেমন আছিস, কোথায় আছিস। আজকে এত বছর পরে তারা তোকে খুঁজে বের করেছে, কারন তাদের দরকার। তুই কি মনে করেছিস ওরা কিছু জানে না, তোর আর শ্যামার বøাড গ্রুপ এক, ওরা সেটা জানে, আর জানে বলেই তোকে——— কারন ওরা জানে তুই এখনো শ্যামার প্রতি দুর্বল।
শমীক ঃ ওহ্ রানা , এই নিয়ে তোর সঙ্গে কোন তর্ক করতে চাই না।
রানা ঃ তর্ক করতে চাইছিস না, কারন আমার কথায় লজিক আছে, আর লজিক এখন তোর ভালো
লাগবেনা , কারন তুই এখন আবেগে অন্ধ।
কাট্
দৃশ্য ঃ ১৩
(শমীক ঘর থেকে বেরোয়, স্কুটারে ওঠে, রাস্তায় চলার শট, শমীক থামে ডাক্তারের অফিসের সামনে, ভাড়া মিটিয়ে চেম্বারে প্রবেশ করে)
(ডাক্তারের চেম্বার। ডাক্তার মনি এবং শমীক বসে)
মনি ঃ তোর কপাল তো খারাপরে বেটা।
শমীক ঃ কেন মনিদা।
মনি ঃ গ্রুপ ম্যাচ করেছে।
শমীক ঃ তার মানে আমারটা চলবে।
মনি ঃ চলবে মানে, এবসিলিউটলি পারফেক্ট।
শমীক ঃ যাক মেয়েটা তাহলে বাঁচবে।
মনি ঃ তোর এতো কিসের দায়।
শমীক ঃ আছে দায় আছে তুমি বুঝবে না।
(কিছুক্ষন দুজনে নিঃশ্চুপ)
মনি ঃ ডবল কিডনি ফেইলর, একটা ট্রান্সফার করতে পারলে বেঁচে যাবে। কিন্তু তোর রইলো বাকী
একটা, অবশ্য একটা কিডনী নিয়েও মানুষ সুস্থভাবে বেঁচে থাকে, কিন্তু তোর বাকী একটাই যখন ফেল করবে।
শমীক ঃ কেন তোমার একটা নিয়ে নেব।
মনি ঃ যা ভাগ, আমি দিলেতো।
(দুজনেই হাসে)
কাট্

দৃশ্য ঃ ১৪
পত্রিকা কেনে একটা দোকান থেকে। হাটতে থাকে শমীক কপালের ঘাম মুছে। হাটতে হাটতে শমীক প্রবেশ করে শ্যামাদের বাড়ি। কলিং বেল টেপে, দিলু দরজা খোলে, দুজনেই দুজনকে দেখে স্তব্ধ।
দিলু ঃ শমীক!
শমীক ঃ চাচা! আমি———!
দিলু ঃ এসো ভেতরে এসো।
(শমীক দিলুর পিছু পিছু ডাইনিং রুমে প্রবেশ করে, ডাইনিং রুমে শমীকের তোলা শ্যামার একটা বড় ছবির সামনে গিয়ে দিলু দাড়ায়, শমীক তার পেছনে দাড়ায়)
দিলু ঃ এমন একসময়ে তুমি এসোছো শমীক, এখন আমার খুব বিপদ, এত বড় বিপদ যে—-
শমীক ঃ আমি জানি চাচা।
দিলু ঃ আমি জানি, তুমি জান।
শমীক ঃ পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে কিছু হবে না চাচা।
দিলু ঃ কি বলছো?
শমীক ঃ আমি জানি চাচা, কিছুই হবেনা, কেউ এগিয়ে আসবে না।
দিলু ঃ তাহলে—- তাহলে—- আমি কি করবো।
শমীক ঃ চাচা—–
দিলু ঃ বল!
শমীক ঃ আমি, আমার কাছে তেমন জমানো টাকা নেই যে আপনাকে দেব।
দিলু ঃ তোমার কাছে আমিতো কিছু চাইতে পারি না শমীক।
শমীক ঃ কেন আমার সঙ্গে আপনার কোন সম্পর্ক নেই তাই।
দিলু ঃ না তা নয়, আমি আমার জন্য চাইতে পারি , শ্যামার জন্য কিছু চাইতে পারি না।
শমীক ঃ ঠিক আছে, আপনি নিজের জন্য চাইবেন, মেয়েতো আপনার নিজের——
দিলু ঃ এ হয় না শমীক, হয় না।
শমীক ঃ আমি আমার একটা কিডনি দিতে চাই চাচা, শ্যামার আর আমার গ্রুপ এক, আর তাছাড়া
ডাক্তারের সঙ্গেও কথা বলেছি।
দিলু ঃ শমীক তুমি এখন যাও, প্লিজ, শমীক যাও।
(শমীক ধীর পায়ে বেরিয়ে যায়, দিলু দরজা বন্ধ করে, শমীক রাস্তায় নামে, তখন প্রায় রাত, হঠাৎ করে বৃষ্টি নামে শমীক ভিজতে ভিজতে এগিয়ে যায় অনেকদুর পর্যন্ত শমীককে দেখা যায়, বারান্দায় দাড়িয়ে দিলু দেখেন শমীকের চলে যাওয়া)

দৃশ্য ঃ ১৫
(রাত। দিলু আর ফুপু ড্রইং রুমে)
দিলু ঃ আমার এখনও বিশ্বাস হচ্ছে না।
ফুপু ঃ কেন
দিলু ঃ শমীক রাজি হবে আমি ভাবতেই পারিনি।
ফুপু ঃ শমীক কিন্তু ভেবে চিন্তেই কথা দিয়েছে, ভাববার জন্যে সে পুরো চব্বিশ ঘন্টা সময় নিয়েছে।
দিলু ঃ কিন্তু একবারও কি আপনার মনে হয়নি, শমীক কোন স্বার্থে কার স্বার্থে এ কাজ করছে!
ফুপু ঃ স্বার্থের কথা বলছিস, শমীককে নিজেদের মানদন্ডে বিচার নাইবা করলি।
দিলু ঃ স্বার্থ আমার আছে, স্বীকার করি আমি স্বার্থপর,আমি সবকিছুর বিনিময়ে আমার মেয়েটাকে
বাঁচাতে চাই, তাতে যদি সমস্ত পৃথিবীর ক্ষতি হয়ে যায়, আমার কিছু যায় আসে না। কিন্তু সবকিছুর পরেও আমিতো মানুষ, শমীক আমার জন্য, আমাদের জন্য যা করছে তার বদলে তাকে আমরা কি দিচ্ছি।
ফুপু ঃ শমীক তো কিছু আশা করে না, সে নিজের মতো করে ভাবে, সে শ্যামাকে ভালোবাসতো,
এখনও বাসে, তার বোধ, তার শক্তি, তার সামর্থ্য সে এখন কাজে লাগাতে চায়, তা শ্যামার জন্যই হোক না কেন!
দিলু ঃ ঠিক আছে, তাই হোক।
ফুপু ঃ নিজের চিন্তার সীমাবন্ধতা আর গন্ডীর বাইরে একটু ভাবতে দোষ কি—-
দিলু ঃ তাই হবে ভাবী, তাই হবে।
ফুপু ঃ তবে শমীকের একটা শর্ত আছে।
দিলু ঃ কি?
ফুপু ঃ গোপনীয়তা।
(দিলুর মুখে জুম ইন)
কাট্

দৃশ্য ঃ ১৬
(দিলুর চিন্তিত মুখ, অপারেশন থিয়েটারের সামনে বসে,সঙ্গে ফুপু শ্যামাকে অচেতন অবস্থায় দুজন নার্স ও. টি. তে নিয়ে যায়। দিলু দাড়ায়, শমীককে ট্রলিতে করে নিয়ে আসে দুজন নার্স, পাশে রানা হাতধরে আছে। ও, টি র সামনে এসে ট্রলি থামে, দিলু , ফুপু এগিয়ে আসে)
দিলু ঃ শমীক,
শমীক ঃ চাচা দোয়া করবেন।
(ট্রলি নিয়ে ও.টিতে ঢুকে যায় শমীক, ট্রলি গিয়ে থামে শ্যামার পাশে, শমীক তাকায় অচেতন শ্যামার মুখের দিকে, ডাক্তার শমীককে ইনজেকশান দেয়, শমীকের দৃষ্টি ঝপসা হয়ে আসে, বাইরে সবাই চিন্তিত, অপারেশন চলছে, ডাক্তাররা ঘামছে, ঘড়িতে ছয় ঘন্টা সময় পার হয়, ডাক্তার বেরিয়ে আসে)
দিলু ঃ ডাক্তার
ডাক্তার ঃ সাকসেসফুল, এন্ড বোথ ও.কে.
দিলু ঃ থ্যাঙ্ক ইউ ডাক্তার, থ্যাঙ্ক ইউ.
ডাক্তার ঃ থ্যাঙ্ক ইউ যা দেবার ছেলেটাকে দাও, ইঁঃ ৎবসবসনবৎ ুড়ঁ যধাব ঃড় শববঢ় রঃ
ংবপৎবঃ.
কাট্

দৃশ্য ঃ ১৭
(হাসপাতালের কেবিন, লুনা শমীককে স্যুপ খাওয়াচ্ছে)
শমীক ঃ উহু আর না।
লুনা ঃ এ্যাই ফাজলামী না, পুরোটা খেতে হবে।
শমীক ঃ তুমি তো আমার মায়ের মতো যন্ত্রনা করো।
লুনা ঃ আপনার মা জানলে আর রক্ষা ছিলনা। আমি বলেছি বিশ দিনের টুরে ঢাকার
বাইরে গেছেন। বিশ দিনে টোটাল ফিট্ হওয়া চাই কিন্তু।
শমীক ঃ রানা এলো না।
লুনা ঃ ওইতো আমাকে নামিয়ে দিয়ে গেলো, আপনি ঘুমাচ্ছিলেন, ফিরবার পথে নিয়ে যাবে।
শমীক ঃ তোমরা আমাকে এতো ভালোবাসো, সত্যি তোমরা না থাকলে।
লুনা ঃ তবুও সব ভালোবাসা দিয়ে রেখেছেন ওই শ্যামা মেয়েটার জন্যে, এখন যদি আমার কিডনী
দুটো নষ্ট হয়ে যায় তখন কি করবেন?
শমীক ঃ যাও সেটা বাকী আছে সেটাই দিয়ে দেবো।
(দুজনে হেসে ওঠে, রানার প্রবেশ)
রানা ঃ এই এই এতো জোরে হাসিস না ব্যাটা , সেলাই খুলে যাবে, লুনা তোমারও কমনসেন্স এতো
কম।
লুনা ঃ কি করবো, হাসির কথা বললোতো! কাঁদবো?
কাট্

দৃশ্য ঃ ১৮
(সময় সকাল। অন্য একটা কেবিনে শ্যামা, ফুপু তাকে কিছু খাওয়াচ্ছেন, দিলু বসে আছে মাথা নীচু করে)
শ্যামা ঃ শেষ পর্যন্ত বাবা , আমি মনে হয় বেঁচে গেলাম,(দিলু নিশ্চুপ, ফুপু তাকায় তারদিকে)
শ্যামা ঃ বাবা,
(দিলু চমকে ওঠে, ফুপু নিঃশব্দে হাসে)
শ্যামা ঃ তুমি আমার কথা শুনছো না বাবা।
দিলু ঃ শুনছি, বল,
শ্যামা ঃ বলতো আমি কি বলছিলাম।
দিলু ঃ (হেসে) বল শুনছি।
শ্যামা ঃ এত আনমনা থাক কেন বাবা, কি ভাব এত।
দিলু ঃ কিছু না।
শ্যামা ঃ আচ্ছা বাবা, আমার জন্য কিডনী পাওয়া যাচ্ছিল না, হঠাৎ করে কোথায় পেলে, কিনলে?
দিলু ঃ সেটা জানা কি জরুরী।
শ্যামা ঃ বাহ্ আমি অন্য একজন মানুষের কিডনী নিয়ে বেঁচে থাকবো অথচ জানবো না মানুষটা কে!
দিলু ঃ জীবনে সব কিছুই কি জানা যায়।
শ্যামা ঃ চেষ্টাতো করি। কোথা থেকে এলাম, কোথায় যাবো——–
দিলু ঃ প্রতিদিন যে চালের ভাত আমরা খাই, সেই চাল উৎপন্ন করে যে কৃষক তাকে আমরা কতটুকু
জানি, কতটুকু জানতে চেষ্টা করি।
শ্যামা ঃ তার মানে তুমি বলতে চাইছ না।
দিলু ঃ হ্যা ——-
(বলেই ফুপুর চোখে চোখ পড়ে)
ফুপু ঃ কই হা করো স্যুপটা খাওতো।
(দিলু ঘর থেকে বেরিয়ে যায়)
কাট্

দৃশ্য ঃ ১৯
(রাত। হাসপাতালের কেবিন। শমীকের ঘরে একটা মাত্র বাতি জ্বলছে, শমীক একটা বই পড়ছে, পাশে অনেক বই। ইজি চেয়ারে রানা ঘুমিয়ে)
(দিলু দরজা ঠেলে প্রবেশ করে)
শমীক ঃ চাচা! আসুন।
দিলু ঃ এখনও ঘুমোওনি।
শমীক ঃ রাত বেশী হয়নি। মাত্র এগারোটা।
দিলু ঃ অসুস্থদের জন্যে ঘুমোবার সময়।
শমীক ঃ ভুল বললেন চাচা, সুস্থরাই এত তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ে, অসুস্থরাই অনেক রাত পর্যন্ত জেগে
থাকে।
দিলু ঃ তাহলে তুমি বলতে চাও আমিও তোমার মতো অসুস্থ।
শমীক ঃ কি জানি
দিলু ঃ শ্যামা ঘুমিয়ে পড়েছে, তাই ভাবলাম এই সুযোগে তোমাকে একট ু দেখে যাই।
শমীক ঃ খুব ভালো করেছেন, তবে একটা কথা, ঢ়ষবধংব কৃতজ্ঞতা জানাবার চেষ্টা করবেন না। অ
ামার খুব খারাপ লাগবে।
দিলু ঃ আচ্ছা যাও তেমন কিছু বলবো না। কিন্তু এত রাত জেগে কি কর।
শমীক ঃ পড়ি, প্রচুর বই আমি পড়ে ফেলেছি, যতই পড়ি মনে হয় এত কম জানি, তখন আরও বেশী
পড়তে ইচ্ছে করে।
দিলু ঃ শ্যামা ঠিকই বলে তোমার সঙ্গে আমার অনেক মিল।
শমীক ঃ বলে নাকি।
দিলু ঃ হ্যা, আচ্ছা একটা কথা বলবে।
শমীক ঃ বলুন, (রানা ঘুম ভেঙ্গে অবাক হয়ে শুনছে)
দিলু ঃ তোমার আর শ্যামার সম্পর্ক ছাড়াছাড়ি হয়ে গেলো কেন?
শমীক ঃ আপনার প্রশ্নের উত্তর আমি জানি, কিন্তু—-
দিলু ঃ কিন্তু কি——?
শমীক ঃ আপনি আমাকে খুব ব্যক্তিগত বিষয়ে প্রশ্ন করেছে।
দিলু ঃ (কিছুক্ষন চুপ থেকে) আই এ্যাম সরি শমীক, আই এ্যাম সরি
(দিলু বেরিয়ে যায়)
কাট্

দৃশ্য ঃ ২০
(দিলু শমীকের কেবিন থেকে বেরিয়ে আসে, শ্যামার কেবিনে উকি দেয়, শ্যামা ঘুমিয়ে আছে, দিলু হাসপাতালের করিডোরে হাটে, বিষন্ন, দেয়ালে হাত রেখে ঝুকে রাতের রাজপথ দেখে, নীচ থেকে অনেক উপরে বারান্দায় ক্যামেরা দিলুর মুখে জ্মু ইন)
কাট্

দৃশ্য ঃ ২১
(শ্যামার কেবিন। দিলু শ্যামার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন)
দিলু ঃ শ্যামা।
শ্যামা ঃ হু।
দিলু ঃ কিছু খাবি।
শ্যামা ঃ না, বাবা, সাঈদ আসেনি।
দিলু ঃ সকালে এসছিলো, তুই ঘুমাচ্ছিলি, অফিস শেষে আবার আসবে।
শ্যামা ঃ তুমি সাঈদকে পছন্দ করনা তাই না বাবা,
দিলু ঃ অপছন্দের কি আছে
শ্যামা ঃ তুমি ওর সঙ্গে ভালো করে কথা বলনা, বিরক্ত হও, কেন? ছেলে হিসাবে সাঈদ কি খারাপ
(দিলু নিশ্চুপ)
শ্যামা ঃ অথচ- শমীকের সঙ্গে সব সময় হেসে হেসে কথা বলতে, রাস্তায় দেখা হলে চিৎকার করে
ডাকতে, ঘন্টার পর ঘন্টা রাজনীতি আর দেশ নিয়ে তার সঙ্গে তর্ক করতে।
দিলু ঃ (বিব্রত) এসব প্রসঙ্গ থাক শ্যামা।
শ্যামা ঃ আমার কোন পছন্দই তোমার পছন্দ না শুধু শমীক ছাড়া, যেদিন থেকে বুঝতে পারলাম
শমীককে তোমার পছন্দ, সেদিন থেকে কেন জানি শমীকের প্রতি আমার ফিলিংস কমতে থাকলো।
দিলু ঃ এটা কোন কারন হলো, নিশ্চই ,এমন কিছু আছে—-
শ্যামা ঃ তাছাড়া শমীকের স্যাটেল কিছু ছিল না, যে চাকরী করতো সেটাও আহামরি কিছুনা,
দিলু ঃ আমাদের মত মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনে, এত কম সময়ে কেউ সেটেলড্ হবে ভাবাই ভুল।
শমীককে সেই সময় তুমি দিয়েছিলে? দাওনি, তার মত মানুষকে কষ্ট দিয়েছ এ পরাজয় তোমার, তার নয়।
(শ্যামা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে)
কাট্
দৃশ্য ঃ ২২
(সকাল। হাসপাতালের বারান্দা। দিলু দাড়িয়ে আকাশ দেখছে, রানা একটা হুইল চেয়ারে বসা শমীককে নিয়ে এগিয়ে আসে, পাশে লুনা কিছু জিনিসপত্র হাতে)
রানা ঃ চাচা আমরা চলে যাচ্ছি।
দিলু ঃ রিলিজড হয়ে গেলো?
শমীক ঃ হ্যাঁ!
লুনা ঃ শ্যামা আর কদিন থাকবে চাচা?
দিলু ঃ আর দিন সাতেক।
শমীক ঃ চাচা!
দিলু ঃ আমার খুব ইচ্ছা করছে, তোমার জন্য কিছু একটা করি।
শমীক ঃ চাচা আমি চাই, আপনি আমার জন্য দোয়া করেন, যাতে আমি সুস্থ থাকি ভালো থাকি।
(লংশটে দেখা যাবে রানা , লুনা শমীককে নিয়ে চলে যাবে, লম্বা করিডোরে দিলু দাড়িয়ে একা, নিঃসঙ্গ)
কাট্

দৃশ্য ঃ ২৩
(বিয়ের তিনদিন আগে, দিলু সন্ধ্যা বেলা অন্ধকারে ড্রইংরুমে একা বসে ছবির এলবাম দেখছে, শ্যামার ছবি শমীকের তোলা, ফুপুর প্রবেশ)
ফুপুু ঃ সন্ধ্যা বেলা ঘর অন্ধকার করে বসে আছেন যে!
দিলু ঃ উ————।
ফুপুু ঃ মেয়েটার পাশে গিয়ে বসলেও তো পারেন। দুদিন পরতো চলেই যাবে।
দিলু ঃ আমার কিছু ভালো লাগে না ভাবী, কোথায় যেন খেই হারিয়ে ফেলেছি, আমার মেয়ের বিয়ে
হচ্ছে, তার মা পাশে নেই। মেয়েটার মনে না জানি কত কষ্ট।
ফুপুু ঃ তবুতো সময় অসময়ে মেয়েটাকে কটু কথা বলতে ছাড়েন না, যান মেয়ের কাছে যান, মেয়েটা
একা বসে কাঁদছে।
দিলু ঃ কাঁদছে কেন ভাবী?
ফুপুু ঃ শ্যামা মা কিছু গয়না পাঠিয়েছে, ওগুলো হাতে নিয়ে কাঁদছে——-।
কাট্

দৃশ্য ঃ ২৪
( শ্যামা একটা গয়নার বাক্স হাতে নিয়ে বসে আছে, চোখে পানি, দিলু প্রবেশ করে)
শ্যামা ঃ আমি চলে গেলে তোমার খুব কষ্ট হবে বাবা!
দিলু ঃ মা—-মারে।
শ্যামা ঃ আমি জানি কারো জন্যে কোন কিছু থেমে থাকে না, মা চলে গেলো, একটা ডিভোর্স লেটার
এলো, একটা লোক আমার হাতে দিলো, আমি তখন কত ছোট, কিছুই বুঝতাম না, আমি চিঠিটা তোমার হাতে দিলাম, তুমি চিঠিটা পড়লে, তারপর আমাকে জড়িয়ে ধরে এমন কাঁদতে শুরু করলে, মনে আছে, ভয় পেয়ে আমিও কাঁদতে শুরু করলাম।
দিলু ঃ মা—-মারে।
শ্যামা ঃ আমি চলে যাবো, তোমাকে কার কাছে রেখে যাবো বাবা, কার কাছে।
দিলু ঃ (ডুকরে কেঁদে ওঠে, শ্যামাকে কাছে টেনে নেয়) মারে—– মা, আমার।

দৃশ্য ঃ ২৫
শ্যামার বিয়ে পরবর্তী অবস্থা, সাঈদ শ্যামার সুখী সংসার, দুজনে ঘুরছে, শ্যামা রান্না করছে, সকালে সাঈদকে ঘুম থেকে ডাকছে, নাস্তা দিচ্ছে, ডিজল্ভ করে দেখা যাবে, শমীক খুব ভোরে পার্কে আস্তে আস্তে হাটছে, অফিসের জন্যে তৈরী হচ্ছে, রাতে শমীক গান শুনছে নিজের ঘরে। সমস্ত ঘরে শ্যামার ছবি, শমীক ঘুরে ঘুরে ছবি দেখে, একটা ছবি নামিয়ে হাত দেয় চোখের নীচে।
কাট্

দৃশ্য ঃ ২৬
(ফ্ল্যাসব্যাক। সাঈদের বাড়ি। সকালে নাস্তার টেবিলে সাঈদ শ্যামা)
শ্যামা ঃ আজকে একটু আগে আসবে———।
সাঈদ ঃ কেন?
শ্যামা ঃ বাবার ওখানে যেতে হবে।
সাঈদ ঃ কেন?
শ্যামা ঃ দুদিন ধরে পেটে ব্যাথা করছে, মনে হয় কিডনীর সমস্যা।
সাঈদ ঃ তোমার অপারেশানের কাগজপত্রতো তোমার বাবার কাছে, ডাক্তার কে যেন?
শ্যামা ঃ বাবার বন্ধু মাহাতাব আংকেল, বাবার সঙ্গেই যেতে হবে।
সাঈদ ঃ ঠিক আছে তৈরী হয়ে থেকো, এসে নিয়ে যাবো।
কাট্

দৃশ্য ঃ ২৭
(শ্যামাদের বাড়ি। বিকেল, বেডরুম)
শ্যামা ঃ বাবা কবে আসবে ফুপু?
ফুপুু ঃ আরো চারদিন, সুনামগঞ্জ গেলে আর আসতে চায় না।
শ্যামা ঃ তাহলে——- কাগজপত্রতো বাবার কাছে।
ফুপুু ঃ তাতেকি, কাগজপত্র বাসায়ই আছে, আমি তোমাকে নিয়ে যাব।
শ্যামা ঃ আজকেই যেতে হবে ফুপু, খুব ভয় লাগছে।
ফুপুু ঃ এতো ভেবনাতো সব ঠিক হয়ে যাবে।
কাট্

দৃশ্য ঃ ২৮
(ডাক্তারের চেম্বার, মাহাতাব সাহেব কি যেন লিখছিলেন, শ্যামা আর ফুপুর প্রবেশ, ফুপুর হাতে একটা ফাইল)
মাহ্তাব ঃ আসুন, শ্যামা কেমন আছিস রে
শ্যামা ঃ ভালো না চাচা,
মাহতাব ঃ ভালো থাকলে কি আর চাচার কাছে আসা! দিলু কোথায় আপা।
ফুপুু ঃ ওতো সিলেটে, ফিশারিজ দেখাশোনা করতে গেছে!
(এ সময় মাগরেবের আযান দেয়)
মাহতাব ঃ আপা, মাগরেবের নামাজটা সেরে আসি, আপনি পড়তে চাইলে দুইতলায় চলে যান, আমার
বউ আছে ব্যবস্থা করবে।
(ফুপু আর ডাক্তারের প্রস্থান)
(শ্যামা এদিক সেদিক দেখে, একসময় টেবিলে রাখা নিজের ফাইলে চোখ পড়ে উপরে বড় করে শ্যামার নাম লেখা, শ্যামা ফাইল খুলে, প্রেসক্রিপশন, এক্সওে প্লেট আরও অনেক কাগজের মধ্যে একটি কাগজে দৃষ্টি এসে থমকে যায়- কন্ট্যাক্ট ফর্ম – ডোনার শমীক আহমেদ, রিসিভার- জারীন মাহবুব শ্যামা। শ্যামা ফাইল বন্ধ করে, চেয়ার ঠেলে উঠে পড়ে, ফাইলটা শক্ত করে ধরে , হঠাৎ পেটের ব্যথায় কুঁকড়ে ওঠে, চেয়ারে বসে পড়ে, ঘামতে থাকে, অস্থিরতা বাড়তে থাকে এক সময় সব শান্ত হয় শ্যামা, ক্লান্ত হয়ে বসে পড়ে। ফুপু র প্রবেশ)
শ্যামা ঃ ফুপু বাসায় চলেন!
ফুপু ঃ কি বলছো ডাক্তার আসুক।
শ্যামা ঃ না , ডাক্তার লাগবে না, এক্ষুনি চলেন।
ফুপু ঃ কেন ? কি হলো
(মাহতাবের প্রবেশ)
মাহতাব ঃ সরি, দেরী হয়ে গেলো আপা, হ্যাঁ শ্যামা বল।
শ্যামা ঃ প্লিজ ফুপু চলেন।
ফুপু ঃ কি ব্যাপার আমিতো কিছুই—-
মাহতাব ঃ কি হয়েছে, আপা?
শ্যামা ঃ প্লিজ, ফুপু আসেন (শ্যামা ফাইল হাতে বেরিয়ে যায়)
(মাহতাব আর ফুপু পরস্পরের দিকে অবাক হয়ে তাকায়)
ফুপু ঃ ফাইল কোথায়!
মাহতাব ঃ কিসের ফাইল!
ফুপু ঃ সর্বনাশ হয়েছে! (প্রস্থান, মাহাতাবের মুখে ক্যামেরা জুম ইন)
কাট্

দৃশ্য ঃ ২৯
(শ্যামাদের বাড়ি। বেডরুম, টপশটে দেখা যাবে, শ্যামা পায়চারী করছে, ফুপু বসে)
শ্যামা ঃ আমি পুরো কন্ট্রাক্ট পড়েছি- এক জায়গায় লেখা আছে উভয়পক্ষ পূর্ণ গোপনীয়তা নিশ্চিত
করবে।
ফুপু ঃ শমীক চায়নি এ ঘটনা কেউ জানুক।
শ্যামা ঃ কেন? জানলে আমি তার কিডনী নিতাম না বলে?
ফুপু ঃ হতে পারে, আর তাছাড়া তোমাকে জানানোর মতো অবস্থা ছিলোনা, তুমি ছিলে ব্যাথায় অস্থির,
সিডেটিভ দিয়ে তোমাকে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছিলো।
শ্যামা ঃ এ জন্যেই বাবাকে যতবার জিজ্ঞেস করেছি, ততবার বাবা এড়িয়ে গেছে।
ফুপু ঃ আমরা যে কোন উপায়ে তোমাকে বাঁচাতে চেয়েছি, তোমার বাবার হাতে কিডনী কেনার মতো
টাকা ছিলো না, আমাদের কারো সঙ্গে তোমার গ্রুপ ম্যাচিং করেনি, তোমার কোন আতœীয়-স্বজন এগিয়ে আসেনি, শমীক নিজে থেকে—–
শ্যামা ঃ বাহ্ কি চমৎকার গল্প, দুইয়ে দুইয়ে চার।
ফুপু ঃ বানানো গল্প, তোমার দুটো কিডনী একসঙ্গে নষ্ট হয়ে গেলো, এটা বানানো, আতœীয়-স্বজন
কেউ খোঁজ নিলো না এটা বানানো, শমীকের সঙ্গে তোমার গ্রুপ ম্যাচ করে গেলো এটা কি আমরা বানিয়েছি।
শ্যামা ঃ তারপর কি হলো, কিডনীর বদলে কতটাকা হাতিয়ে নিলো সে শুনি, স্বার্থ ছাড়া এত বড় ত্যাগ
নিশ্চই সে এমনি এমনি করেনি—-।
ফুপু ঃ ছিঃ শ্যামা ছিঃ, সবকিছু নিজের মানদন্ডে বিচার করোনা, স্বার্থপর কেউ হলে সে হচ্ছো তুমি,
নইলে সাঈদের সঙ্গে পরিচয় হবার পরে তুমি শমীককে যে কষ্ট দিয়েছ—-
শ্যামা ঃ ওহ্ চাচী, চুপ করেন প্লিজ—–
কাট্

দৃশ্য ঃ ৩০
(টপ শটে দেখা যাবে রাতে শ্যামা, সাঈদ ঘুমিয়ে আছে, শ্যামা স্বপ্ন দেখছে)
(দিলু পেপার পড়ছে, শমীক ফুল নিয়ে আসে)
শমীক ঃ ¯øামালেকুম চাচা, শুভ জন্মদিন।
দিলু ঃ সর্বনাশ আজকে সাত তারিখ নাকি!
শমীক ঃ জ্বী, কিন্তু সর্বনাশ কেন আজকে তো আপনার জন্মদিন,
দিলু ঃ গতমাসে শ্যামা আমাকে বলেছিলো আমার জন্মদিনে চাইনিজ খাওয়াতে হবে, আমিতো ভুলে
বসে আছি, এদিকে পকেটেতো টিকটিকি ঘুরছে।
শমীক ঃ চলেন আজকে আমি খাওয়াই।
দিলু ঃ আমার জন্মদিন, তুমি খাওয়াবে কেন? তোমার সঙ্গে আমার সম্পর্ক যেন কি? কাম্ অন বি
ক্লিয়ার, হোয়াট ইজ দা সম্পর্ক, টেল মি,
শমীক ঃ ইয়ে ,মানে!
দিলু ঃ আবার লজ্জাও পাচ্ছো দেখি, তুমি শ্যামাকে বল রেডি হতে, আমি আসছি, ব্যবস্থা হয়ে যাবে।
(দিলুর প্রস্থান) (শমীক শ্যামাকে ডাকতে ডাকতে ডাইনিং এ ঢুকে দেখে শ্যামা তার বাঁ চোখে পানি দিচ্ছে)
শমীক ঃ চোখে কি হলো
শ্যামা ঃ দেখো না ফুলে গেছে। ব্যাথা করছে।
শমীক ঃ এক কাজ করা যাক, চোখটা পাল্টে ফেলি
শ্যামা ঃ মানে
শমীক ঃ আমার একটা চোখ খুলে তোমার চোখের জায়গায় ঢুকিয়ে দেই।
শ্যামা ঃ আর তুমি
শমীক ঃ আমি একটা চোখ নিয়ে বেশ চালিয়ে নিতে পারবো।
শ্যামা ঃ কিভাবে
শমীক ঃ ফটোগ্রাফাররা ছবি তোলার সময় একটা চোখ সব সময় বন্ধ রাখে, তাই আমার একটা যথেষ্ট,
আর তাছাড়া,
শ্যামা ঃ আর তাছাড়া
শমীক ঃ আমার চোখ তোমার কাছে থাকলে তুমি সব দেখবে আমার মতো করে।
ডিজল্ভ
(শ্যামার ঘুম ভেঙ্গে যাবে, পাশে সাঈদ, শ্যামা বিছানা থেকে উঠবে, চোখে মুখে পানি দেবে, একগøাস পানি খাবে, বারান্দায় পায়চারী করবে)
কাট্

দৃশ্য ঃ ৩১
(শ্যামা শুয়ে আছে, সকাল, সাঈদ অফিসে যাবার জন্য তৈরী হচ্ছে)
সাঈদ ঃ সাতটা বাজে, এখনো শুয়ে আছো যে,
শ্যামা ঃ বুয়াকে বল নাস্তা করে দিবে
সাঈদ ঃ বুয়ার হাতের নাস্তা আমি খেতে পারি না, জানোই তো।
শ্যামা ঃ আমি পারবোনা
সাঈদ ঃ তোমার কি হয়েছে বলোতো, কাল রাতে একটা কথা পর্যন্ত বললে না, ডাক্তার কি বলেছে।
শ্যামা ঃ আমি কয়েকটা দিন বাবার ওখানে গিয়ে থাকবো।
সাঈদ ঃ আমি একা একা থাকবো?
শ্যামা ঃ আগেতো তো একা একাই থাকতে।
সাঈদ ঃ কি হয়েছে তোমার, এমন করছো কেন, আমার সাথে (শ্যামার মাথায় হাত দেয়)
শ্যামা ঃ হাত সরাও, ছোবে না আমাকে
(সাঈদ আহত হয়ে হাত সরিয়ে নেয়)
কাট্

দৃশ্য ঃ ৩২
(রাত। শ্যামাদের বাসা। বেডরুম, দিলু শুয়ে, শ্যামা বসে)
দিলু ঃ আমার সামর্থের মধ্যে যা করেছি তোর ভালোর জন্যই করেছি।
শ্যামা ঃ আমার ভালো আমি জানতে পারলাম না।
দিলু ঃ বলেছিতো, সে অবস্থা তোমার ছিলো না, ুড়ঁ বিৎব রহ ঃযব পড়সধ. অযথা এখন তর্ক
করছো কেন?
শ্যামা ঃ অযথা তর্ক? আমার শরীরে এমন একটা মানুষের অংশ বহন করছি যাকে আমি সহ্য করতে
পারি না।
দিলু ঃ এক সময় তাকে তুমি ভালোবাসতে, আমাকে এসে বলেছিলে বাবা আমি এই ছেলেটাকে বিয়ে
করতে চাই।
শ্যামা ঃ আমার মাও এক সময় তোমাকে ভালোবাসতো——
দিলু ঃ বাসতো, আমিও, এখনও বাসি, হ্যা, এখন সে ঘর করছে আমারই বন্ধুর সাথে, এর সব দায়-
দায়িত্ব আমার? ভুল যদি কিছু হয়ে থাকে, তা দুজনেরই! তাই বলে জীবন থেকে সংসার থেকে পালিয়ে যেতে হবে, আমিতো পালিয়ে যাইনি, তোমাকে এই ছোট থেকে বড় করেছি, আমার প্রচন্ড কষ্ট হয়েছে, তবু বাস্তবতাকে মেনে নিয়েছি। কারন আমার ভালোবাসার আবেগের সঙ্গে ছিল যুক্তি, ছিলো নৈতিকতা।
শ্যামা ঃ তাই বলে কি মানুষের মন পাল্টায় না।
দিলু ঃ হ্যা সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পাল্টায়, যুক্তি সঙ্গত কারনেই পাল্টায়, কিন্তু শমীককে ছেড়ে
আসার পেছনে তোমার কোন যুক্তি ছিলো না, যতবার তোমাকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছি, তুমি বলেছ তুমি জানো না কেন এমন হলো!
শ্যামা ঃ আমি তোমার মতো করে ভাবিনি বাবা, তোমরা সবাই ছিলে যে যার কাজে ব্যস্ত, শমীকই
আমাকে সঙ্গ দিয়ে, সময় দিয়ে আমার একাকীত্ব ভুলিয়ে রাখতো, এত চমৎকার করে ও কথা বলতো, ওর কথায় ওর আনন্দে আমিও আমার সব কষ্ট ভুলে থাকতাম। এত চমৎকার মানুষ আমি আমার জীবনে খুব কমই দেখেছি বাবা।
(উরংড়ষাব / ঋষধংয ইধপশ)

দৃশ্য ঃ ৩৩
(বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে শ্যামা, শমীক বসে, শমীকের কোলে একটা কালো ব্যাগ)
শ্যামা ঃ ডযধঃ রং ঃযরং
শমীক ঃ দিস ইজ কোল বালিশ
শ্যামা ঃ সেতো দেথতেই পাচ্ছি, কোলে করে বসে আছ, তা বালিশের চেইন থাকে জানতাম নাতো, কি
আছে ভেতরে।
শমীক ঃ ক্যামেরা
শ্যামা ঃ ক্যামেরা
শমীক ঃ হ্যাঁ!
শ্যামা ঃ আচ্ছা এই যে তুমি সারাদিন ছবি তুলে বেড়াও, কত জায়গায় যাও, কত নতুন লোকের সঙ্গে
দেখা হয়, তোমার ভালো লাগে।
শমীক ঃ ভীষন
শ্যামা ঃ এই যে মানুষ দেখ, আমার মতো বাজে দেখতে কোন মেয়ে দেখেছ
শমীক ঃ মাই গড এই থিওরী আবার কবে আবিষ্কার করলে?
শ্যামা ঃ ফাজলামী না, সত্যি করে বলোতো আমি দেখতে কেমন?
শমীক ঃ হু গভীর চিন্তার বিষয়, লক্ষ টাকার প্রশ্ন, দাড়াও চিন্তা করে নেই।
শ্যামা ঃ চিন্তা করতে হবে না, নিজের ছবি দেখেছি এত বাজে ছবি আসে আমার।
শমীক ঃ তাই! আচ্ছা দাড়াও আমি তোমার ছবি তুলে দেবো, দেখবে তুমি হবে ক্লিওপেট্রা।
(বিভিন্ন ভঙ্গিমায়, বিভিন্ন লোকেশনে শ্যামার ছবি তুলছে শমীক)
(ঋষধংয ইধপশ শেষ উরংড়ষাব)

দৃশ্য ঃ ৩৪
(শ্যামা বেডরুমে বসে এলবামে ছবি দেখছে, এলবাম দেখে, দেয়ালে টাঙ্গানো নিজের একটা বড় ছবির সামনে দাড়ায়, ছবিতে হাত দেয়)
উরংড়ষাব / ঋষধংয ইধপশ

দৃশ্য ঃ ৩৫
(শ্যামাদের বাসার ড্রইংরুম, সকাল,শ্যামা সোফায় বসে একটা ম্যাগাজিন পড়ছে, শমীক এসে ঢুকে)
শমীক ঃ শুভ জন্ম দিন শ্যামা ।
শ্যামা ঃ আরে তুমি ! তোমাকেতো ইনভাইট করা হয়নি।
শমীক ঃ তাইতো, কেন আমাকে ইনভাইট করা হয়নি, তেহাত্তরটা কারন দর্শাও।
শ্যামা ঃ কারন একটাই, মা চলে যাবার পর আমার জন্মদিন পালিত হয়না ।
শমীক ঃ আজকে হবে, এই তোমার গিফট্, আমি কেক আনতে চললাম।
(বিশাল একটা প্যাকেট দিয়ে দ্রুত বেরিয়ে যায়)
শ্যামা ঃ শোন শোন, থাম, প্লিজ
(প্যাকেটটা খোলে, শ্যামার নিজেরই একটা ছবি, শ্যামা তন্ময় হয়ে দেখে, এক সময় দিলু পেছনে এসে দাড়ায়, শ্যামার হাত থেকে ছবিটা নেয়)
দিলু ঃ তোর ছবি!
শ্যামা ঃ হু!
দিলু ঃ তোর এত সুন্দর ছবি কে তুললো!
শ্যামা ঃ শমীক, বাবা!
দিলু ঃ শমীক! এই ব্যাটা আবার কে?
শ্যামা ঃ এমন ভাব করছো যেন জান না কিছু।
দিলু ঃ ওহ্ জানি নাকি, (ছবি নিয়ে চলে যেতে থাকে)
শ্যামা ঃ ছবি নিয়ে কোথায় যাচ্ছ।
দিলু ঃ আয় বেডরুমে টাঙ্গিয়ে দিই।
(দিলু বেডরুমে ছবি টাঙ্গায়, শ্যামা তার পিছনে দাড়িয়ে পিঠে হাত রাখে)
(ঋষধংয ইধপশ শেষ উরংড়ষাব)

দৃশ্য ঃ ৩৬
(দিলু ঘুমিয়ে আছে, শ্যামা তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে, এক সময় শ্যামাও ঘুমিয়ে যাবে। উরংড়ষাব)

স্বপ্ন দৃশ্য
(অন্ধকার ভুতুরে পরিবেশ, একটা খালি ঘরের এক কোনে শ্যামা বসে, একটু দুরে শমীক দাড়িয়ে, দুজনের পরনেই সাদা কাপড়)
শ্যামা ঃ তুমি কেন এমন করলে?
শমীক ঃ কি করলাম?
শ্যামা ঃ কেন আমাকে তোমার কিডনী নিয়ে বেঁচে থাকতে হবে?
শমীক ঃ তুমি না চাইতে পারো, আমি চাই, তোমাকে ঋনী করে আমি বেচে থাকতে চাই।
শ্যামা ঃ কেন?
শমীক ঃ তুমিতো আমার সঙ্গে থাকলে না ,আমিই থাকলাম।
শ্যামা ঃ না তা হয় না।
শমীক ঃ কেন হয় না?
শ্যামা ঃ এ আমি চাই নি?
শমীক ঃ তুমি না চাইলেও এখন কিছু করার নেই, আমাকে তোমার সাথে বয়ে নিয়ে বেড়াতে হবে।
যতদিন পৃথিবীতে বাঁচবে ততদিন।
শ্যামা ঃ না এ আমি মানি না, তুমি এমন কষ্ট কেন দিলে আমাকে?
শমীক ঃ তুমি আমায় দাওনি—- প্রতিশোধ নিয়েছি শ্যামা , প্রতিশোধ নিয়েছি——– হা—–হা—-
হা।
(শ্যামা চিৎকার করে ওঠে)
দিলু ঃ কি হয়েছে শ্যামা, কি?
শ্যামা ঃ বাবা আমার যেন কেমন লাগছে।
দিলু ঃ কি হয়েছে মা—
(শ্যামা পেট চেপে ধরে )
শ্যামা ঃ বাবা! বাবা কিডনীটা বের করে ফেলা যায় না?
দিলু ঃ কি বলছিস তুই?
শ্যামা ঃ একটা ছুরি দিয়ে পেটটা চিড়ে ফেলি বাবা, (শ্যামা বেরুতে চায়)
(দিলু শ্যামাকে ধরে ফেলে)
দিলু ঃ শ্যামা
শ্যামা ঃ আমি চাই না বাবা, আমি চাই না,
দিলু ঃ শ্যামা, থাম শ্যামা, কি বলছিস এসব।
শ্যামা ঃ আমি চাই না আমি (শ্যামা জ্ঞান হারায়)
কাট্

দৃশ্য ঃ ৩৭
(পরদিন সকাল। খুব ভোরে শ্যামা ছাদে দাড়িয়ে, নীচ থেকে একটা গান ভেসে আসে, অজয় চক্রবর্তীর গান——— যদি কন্ঠ দাও, আমি তোমার গাহি গান—–
শ্যামা নীচে নেমে এক কাপ চা বানায়, ঘরে ঢুকে দেখে দিলু ঘুমাচ্ছে, ড্রয়ার খুলে বড় একটা খাম বের করে, অনেক চিঠি, শ্যামা চিঠি পড়তে থাকে) ডিজল্ভ
ফ্লাস ব্যাক

দৃশ্য ঃ ৩৮
(শ্যামাদের ড্রইংরুম। শমীক বসে, শ্যামা এসে দরজার পর্দা ধরে দাড়ায়)
শ্যামা ঃ এই তোমার আসার সময় হলো।
শমীক ঃ জ্বী ম্যাডাম
শ্যামা ঃ আমার চিঠি কই?
(শমীক মানিব্যাগ থেকে একটা চিঠি দেয়)
শ্যামা ঃ এত ছোট কেন চিঠি, পনেরো দিনে একটা চিঠি লেখো একটু বড় লিখতে পারো না।
শমীক ঃ প্রেমপত্র একটু ছোট হওয়াই ভালো?
শ্যামা ঃ গতকাল আসোনি কেন?
শমঅক ঃ একটা প্রেস কনফারেন্স ছিলো, তারপর যেতে হলো চিটাগাং,
শ্যামা ঃ আমার মন কি খারাপ হয়েছে জানো, সারাটা বিকেল বাথরুমে দাড়িয়ে কেঁদেছি।
শমীক ঃ বাথরুমে কেন?
শ্যামা ঃ বাসা ভর্তি গেষ্ট, কোথায় কাঁদবো।
শমীক ঃ হুম্ কাঁদাটাও একটা সমস্যা।
শ্যামা ঃ তুমি আমাকে এমন করে কেন কষ্ট দাও বলতো, মাসে মাত্র চারটা দিন দেখা হয়, তার মধ্যে
দুদিন কামাই।
শমীক ঃ সরি, সরি, আর ক্লাস কামাই হবে না, প্রমিজ,প্রমিজ।
শ্যামা ঃ দেখো, আমিও তোমাকে এমন কষ্ট দেবো, তুমি আমাকে ঘৃনা করা শুরু করবে।
শমীক ঃ কি যে বলো
শ্যামা ঃ সত্যি খুব ভালোবাসো আমাকে?
শমীক ঃ অনেক অনেক, বিশাল সমুদ্রের মত, নীল আকাশের মতো, হিজবুল বাহার জাহাজের মতো,
(শ্যামা হাসে)
শমীক ঃ হাসছো কেন?
শ্যামা ঃ কেন এতো ভালোবাসো আমাকে?
শমীক ঃ তোমাকে নিয়ে অনেক ভাবি!
শ্যামা ঃ কি ভাবো?
শমীক ঃ একেক সময় ভাবি তোমাকে নিয়ে দুরে কোথাও চলে যাই, সেখানে থাকবে সবুজ ঘাসের
বিশাল মাঠ, সেই মাঠের সমস্ত ঘাস আমি তোমাকে খাওয়াতে চাই।
শ্যামা ঃ ঘাস?
শমীক ঃ হ্যা ভালোবাসার ক্লোরফিলযুক্ত ঘাস।
(শ্যামা হাসে)
শমীক ঃ আমি তোমাকে ভালোবাসা মোটাতাজাকরন প্রকল্পের আওতায় আনতে চাই, আর সেজন্যেইতো
তোমার প্রচুর পরিমানে ঘাস খাওয়া প্রয়োজন, ক্লোরফিলযুক্ত ভালোবাসা ঘাস।
(দুজনেই হাসে)
ডিজল্ভ

দৃশ্য ঃ ৩৯
(শ্যামার চাচাতো বোন শারমিনের বেডরুম, দুজনে গল্প করছে)
শারমিন ঃ তোমার হাতে ফুল? শমীক ভাই পাঠিয়েছে?
শ্যামা ঃ হু , আজকে আসতে পারবে না, তাই অফিস থেকে পিওনের হাতে ফুল পাঠিয়েছে! যত্তসব।
শারমিন ঃ তাই তো বলি তোমার এত মন খারাপ কেন?
শ্যামা ঃ কারো জন্য আমার মন খারাপ না।
শারমিন ঃ শমীক ভাই কিন্তু মানুষটা ভালো, তোমাকে ভীষন ভালোবসে, তোমার কথা এমন করে বলে,
মনে হয়——
শ্যামা ঃ কি মনে হয়
শারমিন ঃ কিছু না, আচ্ছা এই যে শমীক ভাই তোমার সঙ্গে দেখা করতে পারলো না, ওর বুঝি কষ্ট
হয়না।
শ্যামা ঃ ছাই কষ্ট হয়।
শারমিন ঃ হয়, হয়! ব্যাপাটাতো একতরফা নয়।
শ্যামা ঃ আমি জানি শমীক আমাকে খুব ভালোবাসে, আমিও! তবুও ওর এই হুটহাট উধাও হয়ে
যাওয়াটা আমি মেনে নিতে পারি না —
(ফোন বেজে উঠে, শারমিন ফোন ধরে)
শারমিন ঃ হ্যালো কে? ওহ্ সাঈদ ভাই- কেমন আছেন-আমি? কি করছি- আমার এক কাজিনের সঙ্গে কথা
বলছি, কি নাম? ওর নাম শ্যামা- কি? সুন্দর নাম- দেখতে? ভালোইতো, কেন প্রেম করবেন- কি? কথা বলবেন? দেবো। এই শ্যামা কথা বলবি, বলনা, কিছু হবে না, এমনি এমনি
শ্যামা ঃ হ্যালো——
(শ্যামা বিভিন্ন দিন বিভিন্ন পোষাকে কথা বলবে, ঘড়ির শটে সময় বয়ে যায়, ক্যালেন্ডারের তারিখ দিন চলে যায়। ডিজল্ভ করে সাঈদ শ্যামা হোন্ডায় করে ঘুরছে, পার্কে হাটছে, ইন্টারকাটে দেখা যাবে শমীক শ্যামাদের বাড়ির ড্রইংরুমে বসে ঘড়ি দেখছে, চিন্তিত অপেক্ষা করছে,আবার শ্যামা সাঈদের শট্ , হোন্ডা করে সাঈদ শ্যামাকে বাসায় পৌঁছে দেয়, শ্যামা বাসায় ঢুকেই শমীককে দেখে)
শ্যামা ঃ আরে তুমি? কি ব্যাপার?
শমীক ঃ আজকে সাত তারিখ আমার আসার কথা ।
শ্যামা ঃ ওহ ভুলে গিয়েছিলাম।
শমীক ঃ ভুলে গিয়েছিলে?
শ্যামা ঃ হ্যাঁ ভুলে গিয়েছিলাম, কেন তুমি ভুলে যেতে পার আমি পারি না।
শমীক ঃ আমি কখনও ভুলে যাই না শ্যামা, যখন জরুরী কাজে আটকে যাই তখন আসতে পারি না।
শ্যামা ঃ আমারও জরুরী কাজ থাকতে পারে।
শমীক ঃ হ্যাঁ তা পারে।
শ্যামা ঃ দেখ! আমাকে বিরক্ত করবেনা। আমার এখানে আর আসবেনা, আমাদের বাসার কেউ পছন্দ
করে না?
শমীক বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে।
কাট্

দৃশ্য ঃ ৪০
(ফ্ল্যাসব্যাক শেষ। রাত। শ্যামা বারান্দায় দাড়িয়ে, হাতে একটা বই, দিলু এসে দাড়ায় শ্যামার পেছনে, কাঁধে হাত রাখে)
দিলু ঃ রাত হয়েছে। ঘরে চল ঠান্ডা লাগবে।
শ্যামা ঃ লাগুক
দিলু ঃ কেন এমন করছিস?
শ্যামা ঃ কি করছি?
দিলু ঃ সবাইকে ঝামেলার মধ্যে ফেলে দিয়েছিস।
শ্যামা ঃ আমিতো তোমাদের ঝামেলাই, ঝামেলাই যদি তবে বাঁচিয়েছিলে কেন?
দিলু ঃ বোকার মতো কথা বলিস না। আজকে দুপুর থেকে কিছুই খাসনি, এখন বাজে রাত একটা ঠিক
মতো ঘুমাচ্ছিস না, আর কতো জ্বালাবি আমাকে।
শ্যামা ঃ আর বেশী দিন না বাবা, ইচ্ছে থাকলেও তোমদের আর জ্বালাতে পারবোনা।
(কিছুক্ষন নিরবতা, শ্যামা খুব ধীরে দিলুর হাত ধরে, কাঁদে নিঃশব্দে)
শ্যামা ঃ আমার জীবনটা এমন হলো কেন বাবা, এমনতো হবার কথা ছিলোনা, বাকী আট দশটা মেয়ের
মতো আমার জীবনটা কেন হলো না বাবা।
দিলু ঃ থাক্, এসব কথা থাক।
শ্যামা ঃ কেন থাকবে, আমার সমস্যার কথা যখনই বলতে গিয়েছি তখনই থামিয়ে দিয়েছ, কেন?
দিলু ঃ আমি সবকিছু সহজভাবে নেবার পক্ষপাতি। এত কষ্টের মাঝে, কোন কিছুই আর সিরিয়াসলি
নিতে ইচ্ছে করেনা।
শ্যামা ঃ শমীকও তাই করতো। আমার দুঃখ কষ্ট এড়িয়ে চলতে চাইতো।
দিলু ঃ ও তোকে দুঃখ কষ্ট থেকে দুরে রাখতে চাইতো। সবকিছু সহজভাবে নেবার প্রচন্ড ক্ষমতা তার
ছিল। আর ছিল বলেই এখনো সে বেঁচে আছে, যে কষ্ট আর যন্ত্রনা তুই তাকে দিয়েছিস।
শ্যামা ঃ তোমার সঙ্গে এখনও তার দেখা হয়, তাই না বাবা?
দিলু ঃ মাঝে মধ্যে হয়, সে কখনও আসে না, আমিই যাই,
শ্যামা ঃ কেন যাও বাবা?
দিলু ঃ জানি না, হয়তো ভালোলাগে, তাই।
শ্যামা ঃ কারনটা আমি জানি বাবা, তুমি এবং শমীক দুজনেই খুব নিঃসঙ্গ মানুষ, নিঃসঙ্গ মানুষেরা
একজন আরেকজনকে খুব পছন্দ করে।
দিলু ঃ উপন্যাসের ভাষায় কথা বলছিস।
শ্যামা ঃ উপন্যাসতো জীবনের অংশ বাবা।
দিলু ঃ উপন্যাসে অনেক রং থাকে, সত্যের সঙ্গে দশটা মিথ্যা থাকে।
শ্যামা ঃ তুমি আমকে শমীকের ঠিকানাটা দিবে বাবা।
দিলু ঃ না।
শ্যামা ঃ ঠিকানা পাওয়া কিন্ত খুব কষ্টের কিছু হবেনা বাবা।
দিলু ঃ প্লিজ, শমীককে আর বিরক্ত করোনা, যথেষ্ট কষ্ট আর যন্ত্রনা তুমি তাকে দিয়েছ।
শ্যামা ঃ ঢাকা শহর খুব ছোট্ট একটা শহর, শমীকের মতো সাংবাদিককে এখানে অনেকেই চেনে, যে
কোন পত্রিকা অফিসে ফোন করলেই ঠিকানা পাওয়া যাবে।
দিলু ঃ প্লিজ..।
(শ্যামা রহস্যময় হাসি হাসে)
কাট্

দৃশ্য ঃ ৪১
(ভোর, শ্যামা একটা রিক্সা করে ঠিকানা খুঁজতে খুঁজতে রানাদের বাসার সামনে নামে, তিনতলায় উঠে কলিং বেলে হাত রাখে, লুনা এসে দাড়ায়)
শ্যামা ঃ এটা কি রানা ভাইদের বাসা!
লুনা ঃ তুমি কি শমীকের কাছে এসেছো?
শ্যামা ঃ আপনি আমাকে চেনেন?
লুনা ঃ হ্যাঁ, খুব ভাল করে।
শ্যামা ঃ কেমন করে?
লুনা ঃ কেমন করে? আস ভেতরে আস!
(শ্যামাকে এনে লুনা শমীকের ঘরে দাড় করিয়ে দেয়, সমস্ত দেয়ালে শ্যামার ছবি)
লুনা ঃ এবার বুঝতে পেরেছো? কেমন করে!
(শ্যামা ফুপিয়ে কাদতে থাকে, কাঁদতে কাঁদতে তার হেচকি উঠে যায়, লুনা তাকে জড়িয়ে ধরে,শ্যামা এবার শব্দ করে কেঁদে উঠে))
লুনা ঃ তুমি বস। আমি চা নিয়ে আসি।
শ্যামা ঃ শমীক কোথায়?
লুনা ঃ ওতো সকালে হাটে, কাছেই একটা পার্ক আছে, ডাক্তার হাটতে বলেছে, এসে পড়বে, তুমি বস,
গান শোন, দাড়াও শমীক ভাইয়ের সবচেয়ে প্রিয় গানটা তোমাকে শোনাই——
(লুনা ক্যাসেট প্লেয়ার চালিয়ে দেয়, চলে যায়, শ্যামা একা ঘর ঘুরে ঘুরে দেখে। গান বাজতে থাকে-নয়ন সরসি কেন ভরেছে জ্বলে——-।
(শমীক সিড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে)
শমীক ঃ লুনা, লুনা—– পাঁচ মিনিটের মধ্যে চা চাই—– নাইলে বিশ্বযুদ্ধ ঘোষনা——–
(লুনা এসে দরজা খোলে)
লুনা ঃ আহ্ চিৎকার করবেন নাতো, সর্বনাশ হয়েছে।
শমীক ঃ তোমার সর্বনাশ হলে আমার কি, আমার চা চাই,
লুনা ঃ শ্যাামা এসেছে।
শমীক ঃ সর্বনাশ বলকি?
লুনা ঃ সব ফাঁস হয়ে গেছে মনে হয়, খুব আপসেট মনে হলো।
শমীক ঃ তাহলে তুমি বলে দাও আমি ঢাকার বাইরে চলে গেছি।
লুনা ঃ আমি বলেছি আপনি আছেন। তাছাড়া আপনি পালাবেন কেন আপনার কি দোষ! যান, ভেতরে
গিয়ে দেখা করেন।
শমীক ঃ যাবো? মানে, তুমি যেতে বলছো!
লুনা ঃ হ্যাঁ অবশ্যই।
শমীক ঃ না গেলে হয়না।
(লুনা মাথা নাড়ে, শমীক ধীর পায়ে নিজের ঘরে প্রবেশ করে)
(শ্যামা দরজার দিকে তাকিয়ে আছে, চোখে পানি, মৃদু লয়ে গান বাজছে, শমীক এসে দরজায় দাড়ায়)
শমীক ঃ কেমন আছ?
শ্যামা ঃ (চোখ মুছে) ভাল, তুমি?
শমীক ঃ আমি ভাল আছি!
শ্যামা ঃ তুমি একটুও বদলাও নি এখনও আগের মতোই আছ।
শমীক ঃ বাসা খুঁজে পেলে কি করে।
শ্যামা ঃ তোমার মতো জার্নালিষ্টকে খুঁজে পাওয়া কি খুব কঠিন কাজ।
শমীক ঃ তোমার শরীর এখন ভালো।
শ্যামা ঃ হ্যা — ভেবোনা তোমার কিডনী আমি বেশ যতœ করেই রেখেছি, (কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ)নিজের
স্বার্থেই রেখেছি, কি স্বার্থপর আমি তাইনা। তুমি নিশ্চই এতক্ষনে বুঝতে পারছো, আমি সব ঘটনা জেনেই এসেছি।
শমীক ঃ ইয়ে, মানে, কোন ঘটনা।
শ্যামা ঃ ভান করোনা শমীক, তুমি পারোনা, মিথ্যে বললে তোমার চোখের পলক ঘন ঘন পড়তে থাকে,
এখনও পড়ছে—— তোমার প্রতিটি অভ্যাস আমার চেনা——
(শমীক ধপ করে খাটে বসে পড়ে)
শ্যামা ঃ মাথা তোলে, আমার দিকে তাকাও———- তুমি আমাকে এখনও আগের মতো ভালেবাসো
তাইনা——–(শমীক মুখ ঘুরিয়ে নেয়)—– তোমার সারা ঘরে আমার ছবি।
শমীক ঃ (দাঁড়ায়) আমার সারা অস্তিত্বেও তুমি, ঘুমুতে যাই- তোমার ছবি দেখতে দেখতে, আর ভাবি
কি সোনালী ছিলো সেই দিনগুলি, যখন ঘুম ভেঙ্গে চোখের সামনে তুমি——–মনে হয়, এই মেয়েটি আমাকে ভালোবাসতো, যে রাতে ঘুম আসে না, সারারাত তোমার ছবি দেখে কাটিয়ে দেই, মনে মনে হাজারবার বলি ভালোবাসি——ভালোবাসি!
শ্যামা ঃ এখনও স্বপ্ন দেখো।
শমীক ঃ হ্যাঁ, এখনও চোখ বন্ধ করলেই স্বপ্ন দেখি, মাঝে মধ্যে ইচ্ছে করে স্বপ্নগুলোর পাশে গিয়ে
দাড়াই, দাড়াতে পারিনা বলেই স্বপ্ন আজ এত বড় ভূমিকা নিয়েছে আমার জীবনে—-।
শ্যামা ঃ এতদিন চলে গেলো, তবুও ভুলে যাওনি কেন আমাকে?
শমীক ঃ এরকমইতো কথা ছিলো শ্যামা, সারাজীবন মনে রাখবো।
শ্যামা ঃ আমিতো কথা রাখিনি।
শমীক ঃ আমিতো শুধু তোমার সঙ্গে প্রতিজ্ঞা করিনি, নিজের সঙ্গেও করেছি, নিজের সামনে যখন
দাড়াই, আমার সমস্ত সত্ত¡ায় তুমি।
শ্যামা ঃ এ জন্যই শেষ মুহুর্তে কিডনী দিয়ে আমাকে বাঁচিয়ে ছিলে।
শমীক ঃ না,এটা আমি করেছি দায়িত্ববোধ থেকে।
শ্যামা ঃ তারমধ্যে ভালোবাসা কি কিছু ছিলোনা।
শমীক ঃ ছিলো হয়তো। শোন— তোমাকে একটা কথা বলি, যা হবার হয়েছে, এসব নিয়ে হৈ চৈ করে
লাভ নেই, তোমার সংসার আছে, স্বামী আছে, তোমাকে এখন পেছনে তাকালে চলবেনা।
শ্যামা ঃ আর, তুমি।
শমীক ঃ আমি ভালো আছি, ব্যস্ততা আমার প্রচন্ড, আমার দিন ভালোই কেটে যাবে।
শ্যামা ঃ একা একা ।
শমীক ঃ কেন তোমার কথা ভেবে যদি বাকীটা জীবন কাটিয়ে দেই তোমার কোন আপত্তি আছে।
শ্যামা ঃ আছে তুমি বিয়ে করবে, খুব তাড়াতাড়ি।
শমীক ঃ আচ্ছা যাও দশ সেকেন্ডের মাথায় বিয়ে করে ফেলবো।
শ্যামা ঃ তুমি কি আমার কোন কথাই সিরিয়াসলি নেবেনা।
শমীক ঃ না, সিরিয়াসলী নেইনি বলেই এখনো বেঁচে আছি।
শ্যামা ঃ তুমি আমার সব ছবি নামিয়ে ফেলবে, আমি নিয়ে যাবো।
শমীক ঃ থাকনা শ্যামা। এইটুকু ভালোলাগা নিয়েইতো বেঁচে আছি, তোমার কাছে কখনওতো কিছু
চাইনি।
শ্যামা ঃ তবুও স্বার্থপরের মতো একা একা আমাকে ভালোবাসবে—–
শমীক ঃ হ্যা, বাসবো!
শ্যামা ঃ না পারবেনা—– আমিও তোমাকে ভালোবাসবো,
শমীক ঃ পারো, কিন্তু একটা শর্ত আছে।
শ্যামা ঃ কি শর্ত?
শমীক ঃ এরপর আর কখনও আমাদের দেখা হবেনা এবং তুমি মন দিয়ে সংসার করবে, কোন রকম
ঝামেলা করবেনা, কি রাজি।
(শ্যামা মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়)
শ্যামা ঃ তোমার হাতটা একটু ধরি।
শমীক ঃ না (শমীক শ্যামার শাথায় হাত দেয়, শ্যামা জোর করে সেই হাত ধরে, শমীক হাত ছাড়িয়ে নেয়) তুমি চলে যাও শ্যামা, প্লিজ চলে যাও।(শ্যামা কাদতে থাকে, হেঁচকি উঠে যায়, শমীক খুব কাছেই দাড়িয়ে থাকে, কত কাছে, কিন্তু দুজনেই দুজনের কাছে একা একা)
(শ্যামা চলে যায়। শমীক জানালায় দাড়ায়, একটা করুন সুর বাজতে থাকে, শ্যামাকে নীচের গাড়ী বারান্দায় দেখা যায়, নীচ থেকে শ্যামা দেখে- শমীক জানালায়, শ্যামা পা বাড়ায়। ফ্রিজ)

টেলপ্ এবং কন্ঠে—
জীবন থেমে থাকে না,
এগিয়ে যায় তার নিজস্ব গতিতে,
কেউ কেউ এগিয়ে যায়
একা একা।