দেয়া নেয়া
রচনা : তাহের শিপন

চরিত্রায়ণ
১. ফিজার মা- অনাদৃতা খান বয়স : ৪০ – ৪৫
২. ফিজা- বয়স : ১৫-১৯
৩. রাফি- বয়স :১৩-১৫
৪. রাফির বাবা- আশফাক আহমেদ- বয়স : ৫০
৫. টুসি- রাফির বোন – বয়স : ২২-২৫
৬. রাফির মা- আলেয়া বেগম : বয়স ৪০-৪৫
৭. ফিজাদের বাসার কেয়ারটেকার আবু মিয়া- বয়স : ৪৫
কাহিনী সংক্ষেপ :
ফিজাদের সংসারে মা আর আবু মিয়া ছাড়া কেউ নেই। তার বাবা মারা গেছেন বছর খানেক হল। সংসারের সেইই তদারকি করে। তার বাবা আরমান খান বিশাল ব্যবসায়ী ছিলেন। এখন মা সেই ব্যবসা দেখাশোনা করেন, ভীষন ব্যস্ত থাকেন। তবুও চেষ্টা করেন মেয়েকে সময় দেবার জন্য। অসুস্থ ছিলেন, মাত্র কদিন হলো বাড়ি ফিরেছেন। একটু সুস্থ হয়ে একদিন মেয়েকে নিয়ে শপিং এ গিয়ে আশফাক আহমেদের সঙ্গে দেখা হয়। সঙ্গে তার ছেলে রাফিও ছিল। আলাপচারিতার পর্বটা খুবই রহস্যজনক মনে হয় ফিজার কাছে। রাফির কাছেও। কথাবার্তার মাঝখানে টেলিফোন নম্বর অদল বদল করে ফিজা আর রাফি। প্রায়ই কথাবার্তা হয় দুজনের মধ্যে। একজন আরেকজনকে পছন্দ করে বলে মনে হয়। ফিজা একদিন হঠাৎ করে রাফিদের বাসায় এসে হাজির হয়। রাফি বাসায় ছিলনা। সে টুসি আর আলেয়া বেগমের মুখোমুখি হয়। টুসি তার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে। বেরিয়ে যাওয়ার সময় রাফির সঙ্গে দেখা হয়। ফিজা কথা না বলে চলে যায়। পরের দিন রাফি ফিজার বাসায় যায়। ফিজা দেখা করেনা। ফিজার মায়ের সঙ্গে দেখা হয়। ফিজার মা তার সঙ্গে খুবই বন্ধুবৎসল ব্যবহার করে । সব ঘটনা শুনে তিনি দায়িত্ব নেন ফিজার মান ভাঙ্গানোর। এদিকে রাফির বাবা সব শুনে রাফিকে ফিজার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে মানা করেন। রাফি কিছুই বুঝতে পারেনা। সে বিদ্রোহ করে। একসময় ফিজার মায়ের কাছ থেকে জানতে পারে সে ফিজার ভাই। ফিজাও ঘটনা জানতে পারে সে আসলে ও এডাপটেড চাইল্ড। জানার পর ফিজার চাইতে বেশী মর্মাহত হয় রাফি। সে তার বাবা মায়ের কাছে জানতে চায় কেন ফিজাকে বিক্রি করা হয়েছিল। আসল কারণ কেউ বলে না। এড়িয়ে যায়। একসময় ফিজার মা রহস্য উম্মোচন করেন। ফিজার বাবা বিদেশে গিয়েছিলেন ব্যবসার কাজে, সেখান থেকে তিনি এইডস্ এর জীবানু নিয়ে দেশে ফেরেন। তা তিনি বুঝতে পারেননি। দেশে ফিরে বিয়ে করেন। বিয়ের পর তার এইডস ধরা পড়ে। যার ফলে ফিজার মাও এইচ আই ভি ভাইরাসে আক্রান্ত হন। তারা সন্তান নিলে সেই সন্তানও আক্রান্ত হতো এইচ আই ভি ভাইরাসে, এই ভেবে তারা ফিজাকে দত্তক নেয় অনেক টাকার বিনিময়ে, যা ফিজাও জানতো না। সব ঘটনা প্রকাশ হবার পর সমস্যা জটিল আকার ধারণ করে। এইচ আই ভি সম্পর্কে অজ্ঞতার কারনে সবাই ফিজার মায়ের সঙ্গে অমানবিক আচরণ শুরু করে। ফিজা তার মাকে ছেড়ে চলে যায়। একসময় রাফির ডাক্তার বড়বোন টুসি এগিয়ে এসে সবার ভুল ভাঙ্গিয়ে দেয়। কষ্ট পায় ফিজা, কষ্ট পায় রাফি। পৃথিবীর সবচে মানবিক সম্পর্কের মুখোমুখি হয় সবাই।

দৃশ্য – ১
অনাদৃতা খান অফিস যাচ্ছেন। নাস্তার টেবিলে এসে আয়েশ করে বসেন। আজকে তিনি দেরী করে ফেলেছেন।
অনাদৃতা খান : ফিজা মা..।
ফিজা : মায়োনিজ নাকি ডিম।
অনাদৃতা খান : মায়োনিজ।
ফিজা গরম পাউরুটির স্লাইস নিয়ে প্রবেশ করে। সেও কলেজ যাবার জন্য রেডী।
ফিজা : আজকে এত দেরী করলে।
অনাদৃতা খান : যেদিন বোর্ড মিটিং থাকে সেদিনই আমার দেরী হয়, বোর্ড মিটিং ইজ দ্যা মোস্ট বোরিং পার্ট ইন দ্যা জব।
ফিজা পাউরুটিতে মায়োনিজ লাগিয়ে দেয়। আরমান খান একপিস খেয়ে চায়ে চুমুক দেয়।
ফিজা : মোটে এক পিস।
অনাদৃতা খান : আর সময় নেই, আর ইউ রেডী।
ফিসা : কখন!
অনাদৃতা খান আর ফিজা বেরিয়ে যায়।
কাট্

দৃশ্য – ২
অনাদৃতা খান কে নামিয়ে দিয়ে ফিজাকে নিয়ে গাড়ি কলেজের উদ্দেশ্যে ছুটে যায়।
কাট্

দৃশ্য – ৩
ফিজা একটা কলেজের সামনে গাড়ি থেকে নামে। কলেজের লং শট।

দৃশ্য – ৪
ফিজাদের বাড়ির লংশট। ফিজা কে নিয়ে গাড়ি প্রবেশ করে। গাড়ি থেকে নেমে সে চিৎকার করে।
ফিজা : আবু চাচা…।
ফিজা বাড়িতে প্রবেশ করে।

দৃশ্য – ৫
ফিজা কিচেনে প্রবেশ করে। আবু মিয়া রান্না করছে।
ফিজা : চাচা কতদুর।
আবু মিয়া : সব হয়া গেছে, সবজিটা বাকী।
ফিজা : দেরটা বাজে এখনও সবজি বাকী। মা চলে আসবে না।
আবু মিয়া : তরকারীটা নামায়া ঢেরস কাটতাছি আম্মা।
ফিজা : তুমি ঢেরস কাট যাও, আমি তরকারি দেখি।
আবু মিয়া : আপনে আব্বার মত অস্থির।
ফিজা : অস্থির হব না, তুমি জাননা মা ঠিক দুটোয় লাঞ্চ করে, কোনদিন একমিনিট দেরী করতে দেখেছ, যাও তাড়াতড়ি কর।
আবু মিয়া দ্রুত ঢেরস কাটায় লেগে যায়।

দৃশ্য – ৬
অনাদৃতা খান ভাত খাচ্ছেন। ফিজা ভেজিটেবলের বাটি নিয়ে ঢুকে।
ফিজা : তোমাকে না বললাম একটু ওয়েট কর ভেজিটেবল আসছে।
অনাদৃতা খান : হু দে অসুবিধা নাই, ভেজিটেবল শুরুতে খেতে হবে এমন কোন নিয়ম নেই।
ফিজা : আছে, মা যেসব নিয়ম করে গেছে তার কোনটা আমি ভাঙ্গতে দেবনা।
অনাদৃতা খান নিশ্চুপ তাকিয়ে থাকেন তার মেয়ের দিকে। বাবার ছায়া দেখতে পাচ্ছেন তিনি মেয়ের দিকে। তার চোখ ছলছল করে।
ফিজা : খাও, সকালে একপিস পাউরুটি খেয়ে গেছ শুধু।
অনাদৃতা খান আবার খেতে থাকেন।
অনাদৃতা খান : তুই বস।
ফিজা : তোমার খাওয়া হলে বসবো।
অনাদৃতা খান আবার তাকিয়ে থাকেন। তার চোখ জলে ভরে উঠে।
ফিজা : তাকিয়ে থাকতে হবেনা, খাও।
অনাদৃতা খান আবার খাওয়ায় মন দেন।

দৃশ্য – ৭
একটা বিশাল ডিপার্টমেন্টাল স্টোর। ফিজা আর অনাদৃতা খান শপিং করছে। হঠাৎ ফিজা খেয়াল করলো একটা ছেলে তার দিকে তাকিয়ে আছে। ফিজা তাকাতেই চোখ ঘুরিয়ে নেয়। এ রকম কয়েকবার ঘটে। একসময় ফিজা এগিয়ে যায়।
ফিজা : এক্সকিউজ মি।
রাফি : আমাকে বলছেন।
ফিজা : আমি কি তোমাকে চিনি?
রাফি : না মানে..।
এর মধ্যে অনাদৃতা খান এগিয়ে আসেন।
অনাদৃতা খান : এনিথিং রং।
ফিজা : নাথিং মম।
রাফি : স্লামালেকুম, আমার নাম রাফি।
অনাদৃতা খান : ওয়ালাইকুমুসসালাম।
ফিজা : আমি ফিজানা আহমেদ।
অনাদৃতা খান : ডু উই মিট বিফোর।
এরমধ্যে রাফির বাবা আশফাক আহমেদ আসেন, হাতে কিছূ প্যাকেট, অনাদৃতা খান আর আশফাক আহমেদ একজন আরেকজনকে দেখে স্তম্ভিত হয়ে যান।
অনাদৃতা খান : কেমন আছেন।
আশফাক : জ্বী ভাল।
অনাদৃতা খান : অনেকদিন পর দেখা হল তাইনা।
আশফাক : জ্বী। (বিব্রত)
অনাদৃতা খান : ও আমার মেয়ে ফিজা।
আশফাক : আমার ছেলে রাফি, চল রাফি..।
অনাদৃতা খান : আপনার মিসেস কেমন আছেন।
আশফাক : ভাল, চল রাফি..।
অনাদৃতা খান : চলুন না কোথাও একটু বসি, একটু কথা বলি, চা বা কফি।
আশফাক আহমেদ বিব্রত, রাফি আর ফিজাও বিব্রত।
আশফাক : আরেক দিন না হয়, আজকে একটু তাড়া আছে।
অনাদৃতা খান : এই দশমিনিট, বেশী সময় নেবনা।
আশফাক আহমেদ অনিচ্ছা সত্ত্বেও রাজী হন।
কাট্

দৃশ্য – ৮
একটা ফাস্টফুডের শপ। অনাদৃতা খান, আশফাক আহমেদ, রাফি আর ফিজা প্রবেশ করে।
অনাদৃতা খান : রাফি তুমি একটু ফিজাকে নিয়ে কফি টফি কিছু খাও, আমি তোমার বাবার সঙ্গে একটু কথা বলি।
রাফি ফিজা দুরে একটা টেবিলে বসে। অনাদৃতা খান আর আশফাক সাহেব অন্য একটা টেবিলে বসে।
ফিজা দুটো কফির অর্ডার দেয়। কফি আসে।
ফিজা : কফি খাও।
রাফি : আমি কফি খাই না।
ফিজা : অন্য কিছু খাও।
রাফি : থাক।
ফিজা একটা ড্রিংকস এর অর্ডার দেয়।
ফিজা : তোমার বাবা মনে হয় আগে থেকে আমার মাকে চিনতেন।
রাফি : তাইতো মনে হয়।
ফিজা : আমি কখনো দেখেছি বলে মনে হয় না।
রাফি : অফিসিয়াল ফ্রেন্ড হতে পারে।
ফিজা : মে বি।
রাফি : আপনাদের বাসা কোথায়।
ফিজা : ধানমন্ডিতে।
রাফি : ও।
ফিজা : তুমি করে বলতে পার আমাকে, আমি বোধহয় তোমার ছোটই হব।
রাফি : আমি সেভেনটি নাইন।
ফিজা : ও.. আমি সেভেনটি সেভেন।
রাফি : তুমি বড়।
দুজনে হাসে। ড্রিংকস আসে।
ফিজা : ইটস ওকে, লেট আস বি ফ্রেন্ডস্্।
রাফি : ওকে।
ফিজা : তুমি অনেক কম কথা বল।
রাফি হাসে।
ফিজা : নিজে থেকে একটা কথা বললে না।
রাফি হাসে।
ফিজা : আমি অবশ্য কথা না বলে থাকতে পারিনা। কথা বলে বলে মায়ের মাথা ধরিয়ে দেই। মা অবশ্য কিছূই বলেনা, আমি মুখ দেখে বুঝতে পারি।
দুজনে হাসে। আশফাক সাহেব আর অনাদৃতা খান দুজনে তাকিয়ে থাকেন।
ফিজা : বাবা অবশ্য খুব বকা দিত।
রাফি : এখন দেয় না।
ফিজা : নাহ্ ।
রাফি : কেন?
ফিজা কিছুক্ষন নিশ্চুপ থেকে।
ফিজা : বাবা তো নেই, মারা গেছেন বছরখানেক হয়।
রাফি আহত হয়ে বসে থাকে।
ফিজা : ইটস ওকে, সবাইতো আর সারাজীবন বেঁচে থাকেনা, তোমার মা আছে নিশ্চই।
রাফি সম্মতিসূচক মাথা নাড়ে।
ফিজা : ইউ আর সো লাকি, তোমার মা বাবা দুজনেই আছে।
রাফি হাসে।
ফিজা : ওহ তোমার ফোন নাম্বার দাও।
ফিজা তার ব্যাগ থেকে কাগজ কলম বের করে নিজের ফোন নাম্বার লিখে রাফিকে দেয়।
ফিজা : এই নাও আমারটা, তোমারটা বল।
রাফি ফোন নাম্বার বলে, ফিজা লেখে। আশফাক আর অনাদৃতা খান এগিয়ে আসেন।
অনাদৃতা খান : চল মা, কি রাফি কথা হল ফিজার সঙ্গে।
রাফি : জ্বী।
অনাদৃতা খান : আসো একদিন বাসায় নাকি?
রাফি : জ্বী আসবো, আপনারাও আসুন।
ফিজা : তোমার বাবা কিন্তু বলছেন না।
আশফাক সাহেব বিব্রত।
আশফাক : হ্যা শিওর, আসুননা।
অনাদৃতা খান : আসবো।
সবাই বিদায় নিয়ে চলে যায়। যাবার সময় রাফি আর ফিজা একজন আরেকজনকে দেখে কয়েকবার।

দৃশ্য – ৯
ফিজাদের বাড়ি লং শট। ফিজা গান গাইছে খালি গলায়। (আয়নাতে ওই মুখ দেখবে যখন….)
কাট টু ফিজার ক্লোজ শট গান গাইছে।, ফ্রেম আউট।
কাট টু মিড শটে ফিজা ঘর গোছাচ্ছে। ফোন বাজে, ফিজা মুখ ঘুড়িয়ে দেখে।
কাট টু ফোন ধরে-
ফিজা : হ্যালো।
রাফি : আমি রাফি।
ফিজা : রাফি! দুদিন লাগলো ফোন করতে?
রাফি : তুমি কর নাই কেন?
ফিজা : তুমি কর নাই কেন?
রাফি : এমনিই।
ফিজা : আমার কথা মনে পড়ে নাই।
রাফি : পড়েছে।
ফিজা : তাহলে?
রাফি : জানিনা, এত প্রশ্ন করোনাত।
ফিজা : সরি সরি।
রাফি : কি কর।
ফিজা : কাজ করি।
রাফি : কি কাজ?
ফিজা : ঘরের কাজ।
রাফি : ঘরের কি কাজ?
ফিজা : ঘরের কত কাজ থাকেনা।
রাফি : বলনা কি কাজ।
ফিজা : জানিনা, এত প্রশ্ন করোনাত।
দুজনেই হেসে ফেলে।
ফিজা : এই চলে আসনা।
রাফি : কেন?
ফিজা : এমনি, আমাদের একটা ছোট মাইক্রোবাস আছে, চল ঘুরি।
রাফি : তোমার মা জানলে রাগ করবে।
ফিজা : কিযে বলনা, মাইতো আমাকে কত বলে, আলাদা ড্রাইভার রেখে দিয়েছে আমার জন্য, আমিই যাইনা, মা কি বলে জান?
রাফি : কি?
ফিজা : বলে আমি নাকি বাবার মত ঘরকুনো।
রাফি : তোমার বাবার কি হয়েছিল।
ফিজা : হেপাটাইটিস সি।
রাফি : ডাক্তার দেখাওনি?
ফিজা : বাবা অসুখ লুকিয়ে রাখতো, কাউকে বুঝতে দিত না, একেবারে শেষ মুহুর্তে ধরা পড়েছে।
রাফি : তোমার খারাপ লাগেনা।
ফিজা : খারাপ লাগবে না কেন?
রাফি : না এমন ভাবে বল যেন কিছূই হয়নি।
ফিজা : কেমন করে বলি, দুঃখ দুঃখ ভাব করে বলবো, বাবা মারা গেছে এক বছর, মাকে আমি কখনো বাবার অভাব বুঝতে দিতে চাইনা, মা এত ব্যস্ত থাকে, এই এক বছরে মায়ের দেখাশোনা, আমার পড়াশোনা, রান্না বান্না, বাসার কাজকর্ম, চারজন কাজের লোক সবাইকে আমার দেখতে হয়, এতকিছুর পরে..
রাফি : মাই গড থামো থামো, এইটুকু মেয়ের এত কাজ?
ফিজা : আমার ফুপি অবশ্য আমাকে তার কাছে নিয়ে রাখতে চেয়েছিল, মায়ের কথা ভেবে আমিই যাইনি।
রাফি : তোমাকে দেখলে কিন্তু বোঝা যায়না।
ফিজা : কি বোঝা যায়না।
রাফি : এই যে তুমি এত রেসপন্সিবল।
ফিজা : তোমাকে দেখেও কিন্তু বোঝা যায়না তুমি এত লাজুক।
রাফি : আমি লাজুক?
ফিজা : না হলে ফোন করতে দুদিন দেরী করলে কেন?
রাফি : আবার প্রশ্ন?
দুজনেই হাসে। আবু মিয়া প্রবেশ করে।
আবু মিয়া : ছোট আম্মা, বড়আম্মায় আসছেন।
ফিজা : রাফি এখন রাখি, মা এসেছে।
রাফি : আচ্ছা।

দৃশ্য – ১০
অনাদৃতা খান মাত্র ফিরেছেন অফিস থেকে। ফিজার প্রবেশ।
ফিজা : কখন আসলা।
অনাদৃতা খান : এইতো, তুই কথা বলছিলি, ডাকিনাই, কে?
ফিজা : রাফি।
অনাদৃতা খান : কোন রাফি।
ফিজা : ওইযে সেদিন মার্কেটে দেখা হলো, আশফাক সাহেব।
অনাদৃতা খান : ও, কি চায়।
ফিজা : কিছুনা, এমনি।
অনাদৃতা খান : ও।
ফিজা : মা ওকে যদি একদিন ডিনারে বলি তুমি মাইন্ড করবে?
অনাদৃতা খান কিছুক্ষণ ভেবে
আরমান : নাহ্, মাইন্ড করবো কেন?
ফিজা : তুমি কিন্তু না বলতে অনেক সময় নিলে, থাক তাহলে।
অনাদৃতা খান : না না প্লিজ, আই ওয়াজ আনমাইন্ডফুল, প্লিজ ইনভাইট হিম, আই উইল বি দেয়ার।
ফিজা : থ্যাংকস মা।

দৃশ্য – ১১
ক্লোজ শটে রাফি খাচ্ছে। লংশটে ফিজা বড় একটা মাছ তুলে দেয় রাফির পাতে। রাফি আপত্তি করে। অনাদৃতা খান হাসেন।
ফিজা : খাও খাও, তুমি প্রথম এলে আমাদের বাড়িতে, মাছ খাওতো।
রাফি সম্মতিসূচক মাথা নাড়ে।
ফিজা : বেছে দেব?
রাফি না সূচক মাথা নাড়ে।
ফিজা : দাও বেছে দেই, শেষে গলায় কাটা বিধলে তোমার মা আমাকে ধরবে।
রাফি প্লেট নিজের দিকে টেনে নেয়।
ফিজা : কি হলো।
অনাদৃতা খান : আরে দুই কি শুরু করলি, খেতে দে ছেলেটাকে।
ফিজা : আচ্ছা খাও খাও।
অনাদৃতা খান : বাসায় কে কে আছে তোমার?
রাফি : মা, টুসি, বাবা।
ফিজা : টুসি?
রাফি : মাই এলডেস্ট সিস্টার।
ফিজা : ও।
অনাদৃতা খান : কোথায় পড় তুমি?
ফিজা : পড়াশুনার আলাপ না করলে হয় না মা।
অনাদৃতা খান : তাহলে কি নিয়ে আলাপ করবো?
ফিজা : কি খেতে পছন্দ করে সেটা নিয়ে আলাপ করতে পার, কি রং পছন্দ সেটা নিয়ে আলাপ করতে পার কিংবা..
অনাদৃতা খান : থাম থাম একবার শুরু করলে আর..
রাফি আর ফিজা হাসে।

দৃশ্য – ১২
বারান্দায় অনাদৃতা খান ক্লোজশট। রাফি বসে আছে ক্লোজ শট। লং শটে ফিজা প্রবেশ করে, হাতে কোল্ড ড্রিংকস।
ফিজা : নাও রাফি.. মা।
অনাদৃতা খান : তুই?
ফিজা : আমার সর্দি।
সবাই কিছুক্ষন চুপচাপ।
রাফি : বাবা আপনাদের বন্ধু?
অনাদৃতা খান : তোমার বাবা?
রাফি সম্মতিসূচক মাথা নাড়ে।
অনাদৃতা খান : পড়শি বলতে পার, সেটা অবশ্য তোমার জন্মেরও আগে, ফিজার জন্মের পর আমরা নিজেদের এই বাড়িতে উঠে আসি।
রাফি : ও।
সবাই কিছুক্ষন চুপচাপ।
রাফি : আমি আজকে আসি।
ফিজা : আরেকটু থাক, তোমার সঙ্গেতো কথাই হলো না।
রাফি : রাত হয়ে গেছে।
অনাদৃতা খান : চল তোমাকে পৌছে দিয়ে আসি।
রাফি : না আমি একা যেতে পরবো।
অনাদৃতা খান : এগারোটা বাজে, আবু মিয়া গাড়ির চাবি দাও।

দৃশ্য – ১৩
সময় রাত।
গাড়ির চাকার ক্লোজ, গাড়ি চলছে। ভেতরে অনাদৃতা খান আর রাফি। অনাদৃতা খান ড্রাইভ করছেন।

দৃশ্য – ১৪
রাফিদের বাড়ির সামনে গাড়ি থামে। রাফি নেমে বিদায় নেয়। অনাদৃতা খান গাড়ি ঘুরিয়ে নেন।

দৃশ্য – ১৫
রাফি তাদের ড্রইংরুমে প্রবেশ করে। বাবা বসে আছে।
আশফাক : কোথায় ছিলি।
রাফি : বন্ধুর বাসায়।
আশফাক : সেতো সন্ধ্যার সময়।
রাফি : ডিনারের দাওয়াত ছিল।
আশফাক : তোর কোন বন্ধু।
রাফি : আছে তুমি চিনবেনা।
আশফাক : নাম নেই?
রাফি : ফিজা।
আশফাক : কোন ফিজা।
রাফি : তোমার বন্ধু আরমান খানের মেয়ে।
আশফাক : হোয়াট?
রাফি : কি?
আশফাক : সেদিন পরিচয় হলো আর বাসায় চলে গেলি?
রাফি : ইনভাইট করলোতো।
আশফাক : ইনভাইট করলেই যেতে হবে, তুই জানিস সে কে?
রাফি : কে বাবা?
আশফাক সাহেব ধরা পড়ার ভয়ে-
আশফাক : না ঠিক আছে তুই যা, এরকম আর দেরী করবি না, তোর মা টেনশন
করে।
রাফি গটগট করে চলে যায়, মা প্রবেশ করে।
মা : কোথায় গিয়েছিল?
আশফাক : কোথায় আবার, খান সাহেবের বাসায়।
মা : বলকি, এখন কি হবে?
আশফাক : কি হবে আবার?
মা : কিছু যদি হয়, তখন আমার দোষ দিতে পারবেনা।
আশফাক : কি হবে, তুমি না আগাম বেশী ভয় পাও, কিচ্ছু হবেনা, ছোট মানুষ।
মা : বলেছে তোমকে ছোট মানুষ, এই বয়সের ছেলে মেয়েরাইতো ঝামেলা করে বেশী, আগে থেকে সাবধান না হলে..
আশফাক : তো কিরবো তালা দিয়ে রাখবো?
টুসির প্রবেশ-
টুসি : দরকার হলে তাই রাখতে হবে… তুমিনা বাবা রাফিকে বেশী প্রশ্রয় দাও।
আশফাক সাহেব গুম হয়ে বসে থাকেন।

দৃশ্য – ১৬
একই রাত।
ফিজা ফোন উঠায়।
ফিজা : হ্যালো।
রাফি : আমি।
ফিজা : হু।
রাফি : বকা খেলাম।
ফিজা : কেন?
রাফি : দেরী হয়ে গেছে ফিরতে।
ফিজা : ওহ, আই এ্যাম সরি রাফি।
রাফি : প্রতিদিন মাগরেবের আজানের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ি ফিরতে হবে, এই নিয়ম সবসময় মানা যায় বল, আমি বড় হয়েছি না।
ফিজা : হু, তুমিতো অনেক বড় হয়ে গেছ।
রাফি : কি বলতে চাও তুমি।
ফিজা : না আমাদের রাফি সোনা এখন অনেক বড় হয়ে গেছে, তার এখন অনেক রাত পর্যন্ত বাইরে থাকতে হয়।
রাফি : ভাল হচ্ছে না কিন্তু।
ফিজা হাসতে থাকে। রাফি ফোন রেখে দেয়।
এবার ফিজা ফোন কওে, বাজতে থাকে, রাফি ফোন ধরে না। প্যারালাল ফোন ধরে টুসি।
টুসি : কে?
ফিজা : আমি ফিজা।
টুসি : কি চাই?
ফিজা : রাফি আছে।
টুসি : এখানে রাফি বলে কেউ থাকেনা।
ফিজা : এটা ৯৩৩৮৮৩৯ না?
টুসি : নাম্বার ঠিকই আছে কিন্তু এই নাম্বারে এই নামে কেউ থাকে না।
ফিজা : আপনি কি টুসি।
টুসি চমকে যায়। নিজেকে সামলে
টুসি : আমি টুসি না, এই নামে এখানে থাকেনা, এই নাম্বারে আর কখনো ফোন করবেনা, ঠিক আছে।
টুসি ফোন রেখে দেয়। ফিজা মন খারাপ করে ফোন রেখে কি যেন ভাবতে থাকে। কি যেন একটা ডিসিশান নিয়ে খুশী হয়ে উঠে।

দৃশ্য – ১৭
রাফিদের বাসা। টুসি কিচেনে চা করছিল। কলিং বেল বাজে। টুসি দরজা খুলে দেখে ফিজা দাড়িয়ে।
ফিজা : রাফি বাসায় আছে?
টুসি : নাই।
ফিজা : আমি ফিজা।
টুসি কিছুক্ষন স্থির দৃস্টিতে তাকিয়ে থাকে।
টুসি : ভেতরে আস।
টুসি আর ফিজা ড্রইংরুমে প্রবেশ করে। দুজনে বসে, কিছুক্ষন চুপচাপ।
টুসি : রাফির সঙ্গে তোমার কতদিন পরিচয়।
ফিজা : মাসখানেক।
টুসি : মাসখানেকের পরিচয়ে একটা ছেলের বাসায় চলে এসেছ?
ফিজা : আপনি বোধহয় ভুল করছেন।
টুসি : ভুল শুদ্ধ তোমার কাছ থেকে শিখতে হবে ডেপো মেয়ে কোথাকার?
আলেয়া বেগমের প্রবেশ। টুসি উঠে চলে যায়। ফিজা উঠে দাঁড়ায়। আলেয়া বেগম তার দিকে তাকিয়ে থাকেন, ফিজা ধীর পায়ে বেরিয়ে যায়। বাড়ির লনে রাফির সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। রাফি ফিজাকে কি যেন বলতে চায়, ফিজা দ্রুত পায়ে বেরিয়ে যায়। রাফি আহত হয়ে তাকিয়ে থাকে।

দৃশ্য – ১৮
সময় রাত। ফিজাদের বাড়ির লং শট। ফিজা ছাদে একা দাঁড়িয়ে আছে। তার মন খারাপ। সে কিছুক্ষন হাটাহাটি করে নীচে নেমে আসে।

দৃশ্য – ১৯
রাফি নিজের রুমে বসে গীটার বাজাচ্ছিল, কিছুতেই সুর তুলতে পারছিল না। একসময় বিরক্ত হয়ে গীটার ছুড়ে ফেলে। ফিজাকে ফোন করে, ফোন বেশ কয়েকবার বাজার পর ফিজা ফোন উঠায়। রাফি খুব আগ্রহের সঙ্গে – হ্যালো -বলে, ফিজা কিছুকক্ষণ চুপ থেকে ফোন রেখে দেয়। রাফি অস্থির হয়ে আবার ডায়াল করে। ফিজা বিরক্ত হয়ে রিসিভার উঠিয়ে রেখে দেয়। রাফি অসহায় বোধ করে।
ফেইড আউট।

দৃশ্য – ২০
ফেইড ইন। সময় পরের দিন বিকেল। ফিজাদের বাড়ির লংশট। রাফি ঢুকছে।
রাফি কলিংবেল টিপে। আবু মিয়া আসেন।
আবু মিয়া : আসেন ভাইজান, আসেন।
রাফি : ফিজা নেই।
আবু মিয়া : আছে, ঘুমায়।
রাফি জিজ্ঞাসু নয়নে তাকিয়ে থাকে।
আবু মিয়া : সারা রাইত অস্থির, পায়চারি করছে, কিছু খায় নাই, আম্মায় অনেক অনুরোধ করছে লাভ হয় নাই, কি হইছে কিছু কয় না। আপনে আসেন, আম্মায় বাসায়।
রাফি ড্রইং রুমে প্রবেশ করে।

দৃশ্য – ২১
অনাদৃতা খান তার ল্যাপটপে কাজ করছিলেন। আবু মিয়ার প্রবেশ।
আবুমিয়া : আম্মা রাফি ভাইজান আসছে।
অনাদৃতা খান : ও, চা টা কিছু দিয়েছ?
আবুমিয়া : আসলো মাত্র।
অনাদৃতা খান : দাও চা নাসতা দাও, আমি আসছি।
আবু মিয়া চলে যায়। অনাদৃতা খান ড্রইংরুমের দিকে রওনা হন। যাবার পথে ফিজার রুমে ঢুকে দেখেন ফিজা ঘুমায়।

দৃশ্য – ২২
রাফি বসে আছে ড্রইংরুমে। অনাদৃতা খান প্রবেশ করেন। রাফি উঠে দাড়িয়ে সালাম দেয়।
অনাদৃতা খান : বস বস, কেমন আছ তুমি।
রাফি : জ্বী ভাল।
অনাদৃতা খান : ফিজাতো ঘুমায়।
রাফি বিব্রত হাসি হাসে।
অনাদৃতা খান : আমারও শরীরটা ভাল না, তাই অফিস যাইনি।
রাফি আবার বিব্রত।
রাফি : আমি যাই আরেকদিন আসবো।
অনাদৃতা খান : আরে বস বস, আমার সঙ্গে কি কথা বলা যা না? বস।
রাফি বসে।
অনাদৃতা খান : ফিজার কি হয়েছে তুমি জান কিছু?
রাফি না সূচক মাথা নাড়ে।
অনাদৃতা খান : ওর বাবা মারা যাবার পর, এত অস্থির দেখিনি কখনো।
রাফি মাথা নীচু করে।
অনাদৃতা খান : ফিজাকে আমি কখনো কোন কস্ট পেতে দিইনি। জোরে শব্দ করে কোন কথা বলিনি। এই বাসায় আমরা সবাই তাকে অভিভাবক হিসেবে মেনে নিয়েছি। ওর সব বিষয়ই আমি জানি, তবুও সে এখন বড় হয়েছে, ব্যাক্তিগত ব্যাপার বলে নিশ্চই তারও কিছু আছে, যা সে অন্য কারো সঙ্গে শেয়ার করতে চায় না। আমি জানি ফিজা তোমার খুব ভাল বন্ধু, সি হ্যাড এ গ্রেট ফিলিংস ফর ইউ, তুমি কি কিছু জান।
রাফি : ও কালকে আমাদের বাসায় গিয়েছিল, আমার বোন বোধহয়….।
অনাদৃতা খান : ওহ্ এই ব্যাপার, আমি মনে করলাম কি হল, যাক বাচা গেল, তুমি বস আমি ফিজাকে ডেকে দিচ্ছি।
রাফি : থাক ও ঘুমাচ্ছে।
অনাদৃতা খান : তাতে কি, তুমি এসেছোনা, ঘুম থেকে উঠবে, বস বস আমি ডেকে দিচ্ছি।

দৃশ্য – ২৩
ফিজার রুম। ফিজা ঘুমাচ্ছে। অনাদৃতা খান প্রবেশ করেন। খুব আস্তে করে ফিজাকে ডাকেন। ফিজা ধড়ফড় করে উঠে বসে।
অনাদৃতা খান : রাফি…।
ফিজা : রাফি? রাফির কি হয়েছে মা?
অনাদৃতা খান : কিছু হয়নি, রাফি এসেছে, যা মুখ ধুয়ে ড্রইংরমে আয়।
ফিজা চুপ করে বসে থাকে।
অনাদৃতা খান : কিরে?
ফিজা : ওকে চলে যেতে বল মা।
অনাদৃতা খান : নিজেকে ছোট করোনা।
ফিজা : তুমি জাননা মা….।
অনাদৃতা খান : আমি সব জানি, এরকম হতেই পারে….. সময় দাও, টাইম ইজ দ্যা গ্রেট ফিলার ইন হিউম্যান লাইফ।
অনাদৃতা খান বেরিয়ে যান। ফিজা কিছুক্ষন গুম মেরে বসে থাকে। তারপর বেরিয়ে যায়।

দৃশ্য – ২৪
রাফি বুকসেলফের বই দেখছিল। ফিজা প্রবেশ করে। তার চোখে মুখে সদ্য ঘুম ভাঙ্গা চিহ্ন। রাফি তাকে দেখে একটা মুখভঙ্গি করে- তোমার কি হয়েছে।
ফিজা : কিছু হয় নাই।
রাফি আবার মুখভঙ্গি করে – মিথ্যে কথা।
ফিজা : সত্যি কিছূ হয় নাই, বিশ্বাস কর!
রাফি : আমাদের বাসায় কিছু।
ফিজা : আরে নাহ্ ।
রাফি : টুসি আপু কিছু বলেছে?
ফিজা : আরে নাহ কি বলবে।
রাফি : তুমি আমার কাছে লুকাচ্ছো।
ফিজা : আরে লুকাবো কেন?
রাফি এগিয়ে আসে ফিজার মুখোমুখি দাড়ায়। কিছুক্ষন দুজনে চুপচাপ। ফিজার অস্বস্তি। রাফি ফিজার হাত ধরে, ফিজা বিব্রত, রাফি ফিজার হাত নিজের মাথায় রেখে।
রাফি : এবার বল কিছু হয়নি।
ফিজা ঝট করে হাত সরিয়ে নেয়। রাফির চলে যেতে উদ্যত হয়, ফিজা রাফির হাত ধরে।
ফিজা : তোমাকে আমি খুব পছন্দ করি।
দুজনে কিছুক্ষন নিশ্চুপ।
ফিজা : তোমাদের বাসার কেউ আমাদের রিলেশানটা মেনে নিতে পারছেনা মনে হয়।
দুজনে কিছুক্ষন নিশ্চুপ।
ফিজা : ফারদার আমাদের রিলেশানটা মেইনটেন না করলেই মনে হয় ভাল।
আবার কিছুক্ষন নিশ্চুপ।
ফিজা : একসময় আমরা একজন আরেকজনকে চিনতাম না, মনে কর আমাদের কখনো দেখা হয়নি।
রাফি রেগে উঠে দাড়ায়।
ফিজা : রাফি প্লিজ আমার উপর রাগ করোনা, আমার খুব খারাপ লাগবে।
রাফি গটগট করে বেরিয়ে যায়। ফিজা আহত হয়ে তাকিয়ে থাকে।

দৃশ্য – ২৫
রাফিদের বাসা। ক্যামেরা ট্রলি করে রাফির রুমের দরজায়। রাফি হাতের কাছে যা পাচ্ছে ছুড়ে দিচ্ছে। টুসি পায়ে পায়ে এসে দাঁড়ায়।
টুসি : এসব কি হচ্ছে রাফি।
রাফি চোখ বড় বড় করে বলে
রাফি : গেট লস্ট।
টুসি রাফিররক্ত চক্ষু দেখে বেরিয়ে যায়। একটু পরে মা আসে। রাফি কিছূ একটা ছুড়ে দিয়েছিল, মায়ের উপর গিয়ে পড়ে। আলেয়া বেগম আতংকিত হয়ে বলেন-
মা : কি হয়েছে রাফি।
রাফি : মা তুমি যাও এখান থেকে।
মা : রাফি কি হয়েছে, আমাকে বল।
রাফি : এই বাসায় যখন যার যা খুশী করে, আজ থেকে আমিও তাই করবো, তুমি সরে যাও মা।
মা : কি হয়েছে বাবা আমার…।
মা দৌড়ে এসে রাফিকে জড়িয়ে ধরে, রাফি ভেঙ্গে পড়ে, ফোপাতে থাকে, কিন্তু রাফি কাঁদতে পারে না, কারণ সে বড় হয়েছে, তার সমস্ত কস্টের কথা সে কাউকে বলতে পারেনা… সে চুপ করে মাকে জড়িয়ে থাকে।

দৃশ্য – ২৬
কিছু কোলাজ শট-
১. ফিজা মন খারাপ করে বারান্দায় বসে আছে।
২. রাফি একা একা খালি রাস্তায় হাটছে।
৩. ফিজা একা একা ছাদে বসে আছে।
৪. রাফি তার বোনের সাথে ঝগড়া করছে।
আবহে মিউজিক

দৃশ্য – ২৭
ফিজাদের বাসা। সময় রাত। অনাদৃতা খান আর ফিজা ডিনার করছে, আবু মিয়া পাশে দাড়িয়ে। ফিজার খাবারে মনোযোগ নেই, সে নাড়াচাড়া করছে শুধু। অনাদৃতা খান খেয়াল করেন।
অনাদৃতা খান : কিরে খাচ্ছিস না।
ফিজা : খাচ্ছিতো।
অনাদৃতা খান : তোর কি হয়েছে?
ফিজা : কিছুনা।
দুজন কিছুক্ষন চুপচাপ।
অনাদৃতা খান : রাফি আসছেনা অনেকদিন হয়ে গেল।
ফিজা : আসতে মানা করেছি।
অনাদৃতা খান : কেন?
ফিজা : ওর বাসায় কেউ পছন্দ করেনা।
দুজন কিছুক্ষন চুপচাপ। কলিংবেল বাজে আবু মিয়া বেরিয়ে যায়।

দৃশ্য – ২৮
আবু মিয়া গেট খুলে দেখে রাফি দাড়িয়ে। রাফি ভেতরে প্রবেশ করে।

দৃশ্য – ২৯
ডাইনিং এ রাফি প্রবেশ করে।
অনাদৃতা খান : আরে রাফি যে, বাঁচবে অনেকদিন, বস বস।
ফিজা অভিমান ভরা চোখ নিয়ে তাকিয়ে থাকে।
অনাদৃতা খান : আমাদের মনে পড়লো তাহলে, আমাদের সঙ্গে ডিনার কর নাকি?
ফিজা : আবু চাচা প্লেট দাও।
আবু মিয়া প্লেট এগিয়ে দেয়, রাফির পাতে ভাত বেড়ে দেয়, এক টুকড়া মাছ দেয়।
ফিজা : বড় টুকড়া দাও, ছোট কাটা রাফি বাছতে পারবে না।
রাফি ফিজার দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলে। ফিজাও হাসে, তাদের সম্পর্কটা সহজ হয়ে যায়। অনাদৃতা খান হাত ধুতে উঠে যায়। ফিজা নিজের চেয়ার থেকে উঠে আসে। রাফির পাতের মাছ হাতে নেয়..
ফিজা : বেছে দেই…?
রাফি নীরবে খেতে থাকে, দুজনে কিছুক্ষন চুপচাপ।
ফিজা : এত রাতে আসলা, মা বকবে না?
রাফি চুপ।
ফিজা : কতদিন পরে আসলা জান?
রাফি চুপ।
ফিজা : আমি আসতে না করেছি তাই?
রাফি চুপচাপ খাচ্ছে।
ফিজা : আমি যা বলবো তাই করবা।
রাফি ঝট করে উঠে দাড়ায়।
ফিজা : উঠলা কেন, বস, বস বলছি।
ফিজা রাফির কাধ ধরে বসিয়ে দেয়।
ফিজা : খাও… খাও বলছি, বড়দের কথা শুনতে হয়।
রাফি আবার চুপচাপ খেতে থাকে। এমন সময় অনাদৃতা খান ফিজাকে ডাকেন।
ফিজা : খেতে থাক আমি শুনে আসি, খবরদার উঠবে না।
ফিজা বেরিয়ে যায়, রাফি খেতে থাকে।

দৃশ্য – ৩০
ফিজা তার মায়ের রুমে প্রবেশ করে। অনাদৃতা খান ল্যাপটপে কাজ করছিলেন।
ফিজা : বল।
অনাদৃতা খান : রাফি খাচ্ছে?
ফিজা : হু।
অনাদৃতা খান : ওর সঙ্গে মিটমাট হয়েছে?
ফিজা : মিটমাট আবার কি?
অনাদৃতা খান : অনেক রাত হয়ে গেছে, ওর যাওয়া উচিত।
ফিজা : হু।
অনাদৃতা খান : বাসায় মনে হয় রাগারাগি করেছে, বলেছে কিছু?
ফিজা : মনে হয়।
অনাদৃতা খান : তোর মন মনে হয় খুব ভাল হয়ে গেল, রাফিকে দেখে।
ফিজা : কি করে বুঝলা?
অনাদৃতা খান : মাই গার্ল, তোমার যখন খুব মন খারাপ অথবা ভাল থাকে, তখন কথা বার্তা হয় খুব শর্টকাট, দুই তিন শব্দে।

দৃশ্য – ৩১
রাতের রাস্তায় গাড়ি চলছে। রাফি আর অনাদৃতা খান বসা।
অনাদৃতা খান : আমার মনে হয় তুমি খুব ডিপ্রেসড।
রাফি নিশ্চুপ।
অনাদৃতা খান : আমি চাইলে তোমার প্রবলেম সলভ করতে পারি, কিন্তু
করবোনা।
রাফি অনাদৃতা খানের দিকে তাকায়।
অনাদৃতা খান : তোমার সমস্যা তোমারই সমাধান করা উচিৎ।
রাফি কিছু না বুঝতে পেরে তাকিয়ে থাকে।
অনাদৃতা খান : তুমি এখন বড় হয়েছ… আমি জানি তুমি আর ফিজা একজন আরেকজনকে খুব পছন্দ কর, আই রেসপেক্ট দ্যাট, কিন্তু আমি চাই তোমাদের রিলেশনশিপটা ক্লিয়ার হওয়া দরকার, এখন আমি তোমাকে কিছু কথা বলি মন দিয়ে শোন, আমি যা বলবো সরাসরি বলবো, তোমার সহ্য করতে কষ্ট হবে, তবুও ধৈর্য ধরে শোন….।
দুজনে কিছুক্ষন চুপচাপ
অনাদৃতা খান : ফিজা তোমার বোন, নিজের মায়ের পেটের বোন।
রাফির চোখ আস্তে আস্তে বিস্ফোরিত হয় যেন সে ভয়ংকর কিছু শুনছে। অনাদৃতা খান কথা বলতে থাকেন, রাফি শুনতে থাকে, আবহে মিউজিক।

দৃশ্য – ৩২
রাফিকে অনাদৃতা খান তাদের বাড়ির সামনে নামিয়ে দিয়ে চলে যান। রাফি হতভম্বের মত তাকিয়ে থাকে।

দৃশ্য – ৩৩
অনাদৃতা খান তার বাড়িতে গাড়ি নিয়ে ঢোকেন। ফিজা এগিয়ে আসে।
ফিজা : মা …।
অনাদৃতা খান : আমার ঘরে আস কথা আছে।

দৃশ্য – ৩৪
অনাদৃতা খান তার বেডরুমে প্রবেশ করেন, তার পেছন পেছন ফিজা।
অনাদৃতা খান : বস।
ফিজা বসে।
অনাদৃতা খান : আজকে আমি তোমার জীবনের সবচাইতে বড় সত্যটাকে উম্মোচন করতে চাই। তোমার উপর আমার আস্থা আছে, তুমি আমাকে ভুল বুঝবে না। এতদিন তোমাকে এই ঘটনা বলি নাই, কারণ তোমার বাবা বেঁচে ছিলেন, আর তাছাড়া জানানোর দরকার হয়নি। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে না জানালে জটিলতা আরো বাড়বে। আর ইউ রেডি…।
ফিজা : তুমি আমাকে কঠিন কিছু বলতে চাও।
অনাদৃতা খান : হ্যা চাই।
ফিজা : তুমিতো কোন ভূমিকা ছাড়াই যে কোন কঠিন কথা বলে ফেলতে পার, আজকে এত সময় নিচ্ছ।
অনাদৃতা খান : সময় নিচ্ছি বোঝার জন্য।
ফিজা : কি বোঝার জন্য?
অনাদৃতা খান : তোমার মানসিক শক্তি আছে কিনা।
ফিজা : তুমি বল।
অনাদৃতা খান : ইউ আর নট মাই চাইল্ড।
ফিজা কিছুক্ষন স্থির তাকিয়ে থাকে।
অনাদৃতা খান : আসলে ব্যাপারটা হয়েছে কি…
ফিজা : আমি বিষয়টা জানি।
অনাদৃতা খান বিস্ফোরিত নয়নে তাকিয়ে থাকেন।
ফিজা : বাবার ডায়রী পড়ে আমি জেনেছি।
অনাদৃতা খান : আর কি কি জানো তুমি।
ফিজা : সব… তোমরা আমাকে অনেক টাকা দিয়ে কিনে আনলে, আমি অনেক ছোট্ট ছিলাম, আমাকে আমার পরিবার থেকে অনেক দুরে নিয়ে এলে, যাতে আমি সব ভুলে যাই, এইসব।
অনাদৃতা খান : তুমি জানতে চাওনা, কে তোমার আসল বাবা মা।
ফিজা : জেনে কি লাভ, এতদিন পরে শুধু শুধু জটিলতা বাড়বে।
অনাদৃতা খান : তোমার বাবার ডায়রী কোথায়।
ফিজা : আমার কাছে।
অনাদৃতা খান : যাও নিয়ে আস।
ফিজা বেরিয়ে যায়, অনাদৃতা খান অস্থির পায়চারী করতে থাকেন।

দৃশ্য -৩৫
ফিজা তার ঘরে ঢুকে ড্রয়ার থেকে তার বাবার ডায়রী নিয়ে বেরিয়ে যায়।

দৃশ্য – ৩৬
ফিজা তার মায়ের রুমে প্রবেশ করে ডায়রীটা তার মায়ের হাতে দিয়ে চলে যেতে অনাদৃতা খান তাকে ডাকেন।
অনাদৃতা খান : শোন..।
ফিজা ঘুরে দাড়ায়।
অনাদৃতা খান : তোমার বাবা আসলে মিঃ আশফাক আহমেদ.. রাফির বাবা…।
ফিজা এবার হা করে তাকিয়ে থাকে। অনাদৃতা খান এগিয়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরেন। ফিজার চোখ দিয়ে ঝরঝর করে পানি পড়তে থাকে।

দৃশ্য – ৩৭
রাফি ঝুম মেরে তার রুমে বসে আছে। টুসি যাচ্ছিল, উকি দেয়-
টুসি : কিরে ঝিমাচ্ছিস কেন?
রাফির চোখ লাল, সে কঠিন দৃষ্টিতে তাকায়। টুসি এসে তার পাশে এসে বসে। দুজনেই কিছুক্ষন চুপচাপ।
রাফি : তুমি জান ফিজা কে?
টুসি : হু।
রাফি : আমাকে বল নাই কেন?
টুসি : কি বলবো?
রাফি : কি বলবো মানে?
টুসি : তুইতো তখনো হোসই নাই।
রাফি : তাতে কি, আমি জানবোনা?
টুসি : জেনে কি করতি?
রাফি : আব্বা পারলো এমন একটা কাজ করতে?
টুসি : তাহলে কি করতো, ফিজার বাবা যে টাকা দিয়েছে সেই টাকা দিয়েইতো বাবা ব্যবসাপাতি করে বাবার আজকের অবস্থা, নাহলেতো থাকতে হতো কোথাও কোন টিনের বস্তিতে।
রাফি : তাই বলে কেউ নিজের মেয়েকে…।
টুসি : কি সিচুয়েশানে হয়েছিল সেটা তুই দেখবি না? ফিজার বাবা অসুস্থ ছিল, উনাদের ছেলেমেয়ে হচ্ছিল না, আব্বাকে অস্থির করে ফেললো ফিজা যখন হলো… জোর করে আব্বাকে একটা দোকান করে দিলেন, ব্যবসা ধরিয়ে দিলেন, তবুও বাবা রাজি হয়না দেখে নগদ টাকা নিয়ে এলেন, একসঙ্গে এতটাকা আমিই কোনদিন দেখিনি, বাবা রাজি না হয়ে পারে নাই রাফি, হয়তো বাবা লোভী, কিন্তু আমাদের মুখের দিকে চেয়ে বাবা এটা করছে আমি জানি। এই যে আমি ডাক্তারী পড়েছি এত খরচ, নিজেদের এই বাড়ি কোন কিছুই হতোনা ওই টাকা ছাড়া, বাবা সরকারী ব্যাংকে একটা কেরাণীর পোস্টে ৪,৩০০ টাকার স্কেলে চাকরী করতো। ফিজাকে নিয়ে উনারা একরাতের মধ্যেই এলাকা ছেড়ে চলে যান। আমাদের সঙ্গে কোন যোগযোগই রাখেননি। মা প্রথমে অনেক কান্নাকাটি করতো, কাঁদতে কাঁদতে মায়ের চোখের নীচে কালি পড়ে গেল, না খেয়ে থাকতে থাকতে গ্যাসট্রিক হয়ে গেল, ফিজার বাবা এসে আব্বা, আম্মা আর আমাকে ব্যাংকক নিয়ে গেল, ওখানে আমরা দুমাস ছিলাম, মায়ের চিকিৎসা হলো, দেশে ফিরে ফিজার বাবা আম্মাকে এই বাড়ি কিনে দিল। তার একবছর পর তুই হলি, মাও আস্তে আস্তে ফিজার কথা ভুলে গেল, আমরাও।
রাফি কাঁদছিল, এবার সে উঠে দাঁড়ায়, গটগট করে বেরিয়ে যায়। টুসি হতাশ হয়ে তাকিয়ে থাকে।

দৃশ্য – ৩৮
রাফির বাবা আশফাক আহমেদ ঢুকছিলেন রাফি বেরিয়ে যাচ্ছে দেখে ডাকেন। রাফি যেন কিছুই শোনেনি.. সে দ্রুত বেরিয়ে যায়। টুসি বেরিয়ে আসে।
টুসি : বাবা।
আশফাক : রাফি ওভাবে…।
টুসি : ফিজার ব্যপারটা নিয়ে রাফি খুব আপসেট।
আশফাক : আপসেট কেন?
টুসি : মনে হয় ও পুরো ঘটনা জেনে গেছে।
আশফাক : কি?
টুসি : হ্যা বাবা আমাদের আরো আগেই ওকে জানানো উচিত ছিল, মনে হয় ওই বাসা থেকে সব জেনেছে।
আশফাক : কি বলছিস।
টুসি : হ্যা বাবা।
আশফাক : এখন কি হবে?
টুসি : এত ভেবনাতো, একটা কিছুতো হবেই।

দৃশ্য – ৩৯
সময় বিকেল।
ফিজাদের বাড়ি। ফিজা বারান্দায় দাড়িয়ে আছে। রাফি একটা রিকশা থেকে নামে। ফিজা দৌড়ে দোতালা থেকে নামে। লনে এসে রাফির হাত ধরে ভেতেরে নিয়ে যায়।

দৃশ্য – ৪০
ফিজার বেডরুম। ফিজা রাফিকে নিয়ে আসে। বসায় রাফিকে একটা টুলের উপর, ফিজা হাটু গেড়ে মাটিতে রাফির সামনে বসে।
ফিজা : মুখ শুকনা কেন?
রাফি ম্লান হাসে।
ফিজা : সারাদিন না খেয়ে আছ তাইনা?
রাফি চুপ।
ফিজা : টেবিলে ভাত দিতে বলি?
রাফি মাথা নেড়ে না বলে।
ফিজা : এখন অত লজ্জা কি, এটতো তোমার বোনের বাড়ি।
রাফি করুণ মুখে তাকিয়ে তাকে।
ফিজা : আমি যখন সব শুনলাম, একটুও খারাপ লাগেনি জানো, কিন্তু যখন জানলাম তুমি আমার ভাই তখনই আমার খারাপ লাগা শুরু হলো।
রাফি জিজ্ঞাসু নয়নে তাকায়।
ফিজা : আমাকে নিয়ে কেন এমন হলো, পৃথীবিতে এত মানুষ থাকতে আমার সঙ্গে কেন এমন হলো, আমার জন্য তুমি শুধু শুধু কতগুলো কষ্ট পেলে।
রাফি আর সহ্য করতে পারে না, সরে আসে ফিজার সামনে থেকে। জানালার পাশে এসে দাড়ায় রাফি। ফিজা তার পাশে। একটু পর আনাদৃতা খান এসে দাঁড়ায় রুমে।
অনাদৃতা খান : রাফি কেমন আছ।
রাফি ঘুরে দাড়ায়।
অনাদৃতা খান : আমাদেরকে খুব খারাপ মানুষ মনে হচ্ছে?
সবাই চুপ।
অনাদৃতা খান : তুমি যখন আরো বড় হবে, তখন বুঝতে পারবে মানুষ কত নিরুপায় প্রাণী, আমাদেরকে বেঁচে থাকার জন্য অসহায়ভাবে, নিষ্ঠুর হতে হয়। সুখী হবার জন্য আমরা কতরকম যন্ত্রণা দেই একজন আরেকজনকে, একজনকে কষ্ট দিয়ে আরেকজনের সুখ কেনা মানুষ ছাড়া, অন্য কোন প্রাণীর পক্ষে বোধহয় সম্ভব না।
সবাই চুপ।
অনাদৃতা খান : তুমি কি তোমার বোনকে নিয়ে যেতে চাও।
রাফি আর ফিজা চমকে একজন আরেকজনের দিকে তাকায়।
অনাদৃতা খান হাপাতে শুরু করেন। তার এ্যাজমার টান উঠেছে।
অনাদৃতা খান : আবু মিয়া … আবু মিয়া…।
ফিজা দৌড়ে বেরিয়ে যায়, ফিরে আসে ইনহেলার নিয়ে, অনাদৃতা খান ইনহেলার নেন, ধীরে ধীরে তার শ্বাস কষ্ট কমে আসে।
অনাদৃতা খান : আমার শরীরটা ভাল না… শুয়ে থাকি গিয়ে…. রাফি তুমি কিন্তু খেয়ে যাবে।
অনাদৃতা খান চলে যান। ফিজা রাফির হাত ধরে-
ফিজা : আস ডাইনিংএ আস।
দুজনে বেরিয়ে যায়।

দৃশ্য – ৪১
সময় রাত।
রাফিদের বাসায় ডাইনিংএ সবাই খাবার সামনে নিয়ে বসে আছে। মা, বাবা, টুসি।
মা : ছেলেটা এখনো ফিরলোনা।
বাবা : হু।
মা : হু হু করোনা, একবার খুজে দেখ।
বাবা : কোথায় খুজবো আন্দাজে।
মা : আমার ছেলের কিছু হলে দেখো তোমাকে আমি কি করি।
টুসি : মা থামতো, যাবে আর কোথায়, ফিজাদের বাড়ি…।
মা : ওই মেয়েটাই আমার ছেলেটার মাথা খেয়েছে।
টুসি : ওই মেয়েটা তোমারও মেয়ে মা।
সবাই চুপ, মা বিব্রত।
টুসি : এমন ভাব করো যেন অন্য বাড়ির মেয়ে…। তোমাদের আচার আরচণ খুবই আনহিউম্যান।
বাবা : আমরা আবার কি করলাম।
টুসি : যখন দেখলে প্রবলেম একটা শুরু হয়েছে, শুরুতেই মিটমাট করে দিতে পারতে। তা না মিডল ক্লাসের মতো লুকোচুরি করতে শুরু করলে। বাচ্চা একটা ছেলে… এখন কি ঝামেলা বাধায় কে জানে।
বাবা : ও আবার কি ঝামেলা করবে।
টুসি : বাবা এডলোসেন্টেদের সাইকোলজি নিয়ে আমাদের কোন মাথাব্যাথাই নেই, এইজন্য, এইজন্যই আমাদের মত ফ্যামিলিতে এত সমস্যা।
মা : হ্যা আমাদের মা বাবারাতো আর আমাদের মানুষ করে নাই।
টুসি : হ্যা ১৯৬০ সালের ধারনা নিয়ে এখন ছেলে মানুষ করো, বুঝবে মজা।
হঠাৎ ফোন বাজে। বাবা উঠে ফোন ধরেন, অপর প্রান্ত থেকে কি যেন শুনে হা করে থাকেন।
মা : কি হয়েছে?
বাবা : ফিজার মা অসুস্থ, উনাকে হাসপাতালে নেয়া হয়েছে, রাফি ওখানে।
টুসি : কোন হাসপাতালে?
বাবা : বারডেমে… ও তোদের ওখানে।
টুসি : আমি দেখছি।
মা : তুই কোথায় যাচ্ছিস।
টুসি : আমি একটু দেখে আসি মা।
বাবা : তোর যাওয়ার কি দরকার।
টুসি : দরকার আছে মা, না বুঝেই মেয়েটার সঙ্গে অনেক দুর্ব্যবহার করেছি… আমি যাই।
বাবা : এত রাতে, গাড়ি নিয়ে যা।
টুসি দ্রুত বেরিয়ে যায়।

দৃশ্য – ৪২
হাসপাতাল। স্যালাইনের ব্যাগের ক্লোজশট। কাট টু অনাদৃতা খানের মুখের ক্লোজ আপ।
কাট টু লং শট। অনাদৃতা খান শুয়ে আছেন, ফিজা তার হাত ধরে ব্যাকুল হয়ে বসে আছে।

দৃশ্য – ৪৩
কেবিনের বাইরে রাফি পায়চারী করছে। টুসি আসে।
রাফি : তুমি?
টুসি : উনি কোথায়?
রাফি : ১০১
টুসি : আয়।
রাফি দাড়িয়ে তাকে।
টুসি : আয়?
রাফির হাত ধরে টুসি ভেতরে ঢোকে।

দৃশ্য – ৪৪
রাফি আর টুসি কেবিনের ভেতরে ঢোকে, ফিজা উঠে দাড়ায়।
টুসি : ভেবনা, আমি এখানে চাকরী করি, আমি দেখবো।
ফিজা ম্লান হাসে।
টুসি : জ্ঞান হারিয়েছে কতক্ষণ?
ফিজা : ঘন্টাখানেক হবে।
টুসি : তুমি বাসায় চলে যাও, সকালে এস।
ফিজা : না আমি যাবনা।
টুসি অনাদৃতা খানের ফাইল দেখছিল।
টুসি : থেকে লাভ নেই, সিডেটিভ দেয়া হয়েছে, সারারাত ঘুমাবেন, আর আমিতো রয়েছি, তোমার চিন্তার কোন কারণ নেই, তোমার সঙ্গে কেউ এসেছে?
ফিজা : আবু চাচা…।
টুসি : রাফি ওর সঙ্গে বাসা পর্যন্ত যা।
রাফি আর ফিজা বেরিয়ে যায়, টুসি অনাদৃতা খানের ফাইল চেক করতে থাকে, একজন নার্স আসে, টুসি তাকে কি যেন বলে।

দৃশ্য – ৪৫
গাড়িতে ফিজা আর রাফি। আবু মিয়া পেছনের সিটে।
ফিজা : বছর খানেক হয় মায়ের এরকম হচ্ছে, কয়েকদিন হাসপাতালে থাকে ঠিক হয়ে বাসায় যায়, আবার কয়েক মাস পরে আবার, এই বছর তিনবার হলো, ডাক্তাররাও কিছু বলছেনা।
রাফি : উনার কি অসুবিধা?
ফিজা : আম্মারতো এজমা আছেই, সারা বছর খুকখুক করে কাশবে, কাশিটা সারছে না, রাতে ঘুমায়না ঠিকমত, চোখের নীচে কালি পড়ে গেছে দেখনা, এত নিয়মের মধ্যে রাখার চেষ্টা করি, বাবা মারা যাবার পর থেকে মা আরও ভেঙ্গে পড়েছে।
রাফি : বিদেশে নিয়ে গেলেই পার।
ফিজা : গিয়েছিলাম, কিছুতেই কিছু হচ্ছে না।
রাফি : অসুখটা কি?
ফিজা : ডাক্তাররা ধরতে পারছেনা, নাকি কি হয়েছে পরিস্কার করে কেউই কিছু বলছেনা, সবাই বলছে মনে হয় মেন্টাল ডিপ্রেশান, মেন্টাল ডিপ্রেশান তো আমারও আছে, তাই বলে…।
রাফি : টুসিকে জিজ্ঞেস করি?
ফিজা : বড় বড় ডাক্তাররাই ধরতে পারছে না।
রাফি : টুসির টিচার আছে একজন বারডেমে… ওর সঙ্গে কথা বলা যেতে পারে।
ফিজা : বড় ডাক্তার একটাও বাকী নেই দেশে যাকে দেখাইনি।
রাফি : তবুও একটা চেষ্টা করা যাকনা।
ফিজা : দেখ বলে… তোমার বোনতো আমাকে দেখতে পারেনা।
রাফি : এই তোমার বোন তোমার বোন করছো কেন? টুসি তোমার বোন না?
ফিজা : ওহ্ তাইতো।
দুজনেই হাসে।

দৃশ্য – ৪৬
টুসি বসে আছে তার বস এর রুমে। ডাক্তার খান, যার আন্ডারে অনাদৃতা খান ভর্তি হয়েছেন।
খান : ভদ্রমহিলা আগেও দুবার ভর্তি হয়েছিলেন, আমার আন্ডারেই।
টুসি : কখন প্রথম ধরা পড়লো?
খান : উনার হাজবেন্ডের যখন ধরা পড়লো তার পর পরই, আমি তখন বারডেমে ছিলাম, ওখানেই টেস্ট করনো হয়, বেসিক্যালি শি গট ইট ফ্রম হার হাজবেন্ড।
টুসি : আপনি শিওর।
খান : আই এ্যাম মোর দ্যান ওভার শিওর, আরমান খান অনেকদিন বিদেশে ছিলেন, সেখান থেকেই এইচআইভি পজেটিভ হয়ে দেশে আসেন। কিন্তু উনি সেটা জানতেন না, ওরা আমাদের পারিবারিক বন্ধু, বিয়ের পর আরমান অসুস্থ হয়ে পড়তো মাঝে মধ্যেই, আমার পীড়াপিড়ীতেই বারডেমে এসে টেষ্ট করায়, ধরা পড়ে, আমি সঙ্গে সঙ্গে ওর ওয়াইফকে নিয়ে আসতে বলি, নিয়ে আসে…. তারপরের ঘটনাতো বললামই।
টুসি : স্যার আপনার কি মনে হয় কি স্টেজে আছে।
খান : অবস্থা ভালনা, এরকম অবস্থায় উনারতো বেঁচে থাকার কথা না, শি ইজ অলরেডি এক্সপায়ারড।
টুসি : কি বলছেন স্যার।
খান : মাঝে মধ্যে মানুষ সাইন্সকে ফাঁকি দিয়েও অনেকদিন বেঁচে থাকে মাই চাইল্ড।
টুসি উঠে দাড়ায়।
খান : চলে যাচ্ছ।
টুসি : আমার খুব খারাপ লাগছে স্যার।
খান : তুমি কি ওদের রিলেটিভ?
টুসি চমকে উঠে।
টুসি : জ্বী … না না স্যার, এমনিই, উনার মেয়েটাকে দেখে খারাপ লাগে।
খান : কি আর করা বলো।
টুসি : স্যার ওদেরতো অনেক টাকা, বাইরে নিয়ে গিয়ে চেষ্টা করা যায়না?
খান : সেই চেষ্টাও করা হয়েছে, লাভ হয়নি… ইটস দ্যা এলিভেনথ আউয়ার, কিছু কিছু ভ্যাকসিনওতো পাওয়া যায় অনেক দাম, দামটা অবশ্য ফ্যাক্টর না, কিন্তু কিউর হবে হান্ড্রেড পারসেন্ট কেউ বলতে পারেনা। এইডস মানে মৃত্যু এটাই এখন সত্য মাই চাইল্ড।
টুসি : স্যার আমি যাই।

দৃশ্য – ৪৭
হাসপাতালের আউটভিউ। রাত। টুসি বেরিয়ে এসে গাড়িতে উঠে। তার মন খারাপ।

দৃশ্য – ৪৮
ফিজাদের বাড়ি। ফিজা ফোন উঠায়, রাফিকে ফোন করে।

দৃশ্য – ৪৯
রাফিদের বাড়িতে ফোন বাজে। রাফির বাবা আশফাক সাহেব ফোন উঠান।
ফিজা : ৯৩৩৮৮৩৯
আশফাক : কাকে চাইছেন।
ফিজা : রাফি আছে বাসায়?
আশফাক : ধরো দেখতে হবে, তুমি কে?
ফিজা : আমি ফিজা।
আশফাক : ও ধর।
ফিজা : আপনিতো বাবা তাইনা?
আশফাক সাহেব বিব্রত।
ফিজা : আপনিতো রাফির বাবা তাইনা?
আশফাক : তুমি ধর ডেকে দিচ্ছি।
আশফাক সাহেব ফোন রেখে রাফিকে ডাকতে যান। রাফি এসে ফোন ধরে।
রাফি : হ্যালো?
ফিজা : ঠিকমত পৌছেছ?
রাফি : হ্যা।
ফিজা : আমাকে ফোন করে জানানোর কথা ছিল।
রাফি : ভুলে গেছি।
ফিজা : আমাকে ভুলে গেছ, নাকি ফোন করতে ভুলে গেছ।
রাফি : তুমি না আম্মার মত কথা পেচাও শুধু।
ফিজা : কি করবো আমিতো তোমার মায়ের পেটেই হয়েছি।
রাফি বিব্রত।
ফিজা : কি চুপ হয়ে গেলে যে?
রাফি : না আমি আসলে কিছু মিন করিনি।
ফিজা : টুসি আপু ফিরেছে?
রাফি : না এখনো ফেরেনি।

দৃশ্য – ৫০
আশফাক সাহেবের বেডরুম। তিনি গুম হয়ে বসে আছেন। মা এসে ঢুকেন।
মা : কি হলো গুম হয়ে বসে আছ যে?
আশফাক : মেয়েটা ফোন করেছে।
মা : কোন মেয়েটা?
আশফাক : আরমান খানের মেয়েটা।
মা : এর জন্য গুম হয়ে বসে থাকতে হবে।
আশফাক : আমাকে বললো- আপনিতো বাবা তাইনা?
মা চুপ।
আশফাক : কি অদ্ভুত দেখ, মেয়েটা বাবা ডাকার আগেই, তাকে আমরা দুরে সরিয়ে দিয়েছিলাম, কিন্তু বাবা সে আমাকে ডাকলোই।
মা কেঁদে উঠেন।
মা : তোমার জন্য… সব তোমার জন্য… লোভী … অমানুষ কোথাকার।
মা কাঁদতে থাকেন, আশফাক সাহেব উঠে এসে তার মাথায় হাত রাখেন। টুসি এসে রুমে ঢুকে।
আশফাক : কিরে কি খবর?
টুসি : খবর ভালনা বাবা।
মা : কি হয়েছে বলবিতো।
টুসি চুপ।
মা : কিরে কথা বলছিস না কেন?
টুসি : ফিজার মা এইচ আই ভি পজেটিভ।
আশফাক : কি?
মা : কি বলছিস তুই?
এর মধ্যে রাফি এসে দাঁড়ায় দরজায়।
টুসি : হ্যা মা ফিজার বাবা ছিল এইডস পেশেন্ট, সেটা বিয়ের পরে ধরা পরে, ততদিনে ফিজার মা ইনফেক্টেড হয়। বাচ্চা নিলে সেই বাচ্চাও ইনফেক্টেড হতে পারে এই কথা চিন্তা কওে, তারা বাচ্চা না নিয়ে ফিজাকে এডপ্ট করার ডিসিশান নেয়।
রাফির ইনসার্ট।
আশফাক : কিন্তু আমি শুনেছি মিসেস আরমানের কি যেন প্রেগনান্সি সংক্রান্ত জটিলতা ছিল।
টুসি : ওরা আসলে ব্যাপারটা লুকিয়েছে, সামাজিক লোকলজ্জার ভয়ে।
মা : তুমি দুটো অসুস্থ মানুষের ঘরে আমার মেয়েকে… তুমি একটা অমানুষ… তুমি একটা….।
রাফি বেরিয়ে যায়।
টুসি : আহ মা থামবে?
মা : থামবো মানে? আমার মেয়ের যদি কিছূ হয় তাহলে তোর বাবাকে আমি….।
মা ক্কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে।
কাট্

দৃশ্য – ৫১
রাফি ফোন করছে ফিজাকে। ফিজা ফোন তোলে। মিউটে রাফি ফিজাকে কি যেন বলে। আবহে মিউজিক। ফিজার চোখ বিস্ফোরিত হয়, সে কাঁদতে থাকে, রাফি দ্রুত কথা বলতে থাকে, একসময় ফিজা চোখ মুছে বলে-
ফিজা : এখন আমি কি করবো?
রাফি : তুমি আমাদের এখানে চলে এস।
ফিজা : মাকে ফেলে।
রাফি : ফিজা তোমার যদি কিছু হয়?
ফিজা : কি হবে?
রাফি : তুমি জাননা এটা ছোঁয়াচে, কথন কি হয়ে যায়।
ফিজা : তাই বলে মাকে এমন বিপদে ফেলে চলে যাব?
রাফি : যা হবার হয়ে গেছে… এখন তোমাকেত বাঁচতে হবে, প্লিজ তুমি চলে আস…. যেকোন দিন তুমি ইনফেক্টেড হতে পার, তুমি তোমার মায়ের কাছে যাবেনা, তার ঘরে ঢুকবে না, তার কোন জিনিষ ধরবে না, ঠিক আছে? আমি কাল সকালে তোমাকে নিয়ে আসবো।
ফিজা : রাফি আমি পারবোনা… এতটা স্বার্থপর হতে পারবোনা।
রাফি : পারতে তোমাকে হবেই, নিজের জীবন নিয়ে এমন রিস্ক নিয়োনা, এইডস পেশেন্ট থেকে দুরে থাকতে হয়, প্লিজ ফিজা বুঝতে চেষ্টা কর।
ফিজা আস্তে করে ফোন রাখে। রাফি হ্যালো হ্যালো করে। টুসি এসে দেখে।
টুসি : কি হয়েছে।
রাফি : তোমরা যা বল আর নাই বল, ফিজাকে আমি কালকেই আমাদের বাসায় নিয়ে আসেবো।
টুসি : নিয়ে আসবি মানে?
রাফি : ও কাল থেকে আমাদের সঙ্গে থাকবে।
টুসি : কেন?
রাফি : আমি সব শুনেছি, ফিজার মায়ের যে অসুখ হয়েছে তাতে ফিজার ওখানে না থাকাই ভাল।
টুসি : কি বলছিস তুই?
রাফি : হ্যা আমি জানি এইডস ছোয়াচে রোগ যে কোন সময় ফিজারও হতে পারে।
টুসি : কে বলেছে তোকে এইডস ছোয়াচে?
রাফি : আমি জানি, আমার বন্ধুরা বলেছে।
টুসি : তুই ভুল জানিস।
রাফি : না আমি সব জানি।
টুসি : আয়।
রাফি : কোথায়?
টুসি : আয় আমার সঙ্গে।
টুসি রাফির হাত ধরে জোর করে টেনে নিয়ে বেরিয়ে যায়।

দৃশ্য – ৫২
টুসির রুমে টুসি রাফিকে নিয়ে প্রবেশ করে। টুসি নিজের একটা বই (এইডস বিষয়ক মেডিকেল জার্নাল হতে পারে)।
টুসি : এই দেখ… এটা একটা মেডিকেল জার্নাল, এইখানে….. এইযে এইখানে লেখা রয়েছে দেখ… ইট ইজ এ এসটিডি টাইপ ডিজিজ। মানে সেক্সুয়ালী ট্রান্সমিটেড ডিজিজ…. তুই বড় হয়েছিস, আমার ধারনা তুই বুঝতে পারছিস…।
রাফি মাথা নীচু করে আড়চোখে জার্নাল দেখে।
টুসি : নঁঃ রঃং ঃৎধহংসরঃঃবফ হড়ঃ ড়হষু নু ংবীঁধষ নবযধারধৎ, নু ঃৎধহংসরঃঃরহম নষড়ড়ফ ড়ৎ নু ফরংঢ়ড়লধনষব ংরৎৎরবহমব, ড়ৎ ংযধারহম নষধফব তার মানে কি, রক্ত দেয়া নেয়ার সময় হতে পারে, যেমন ধর কোন রক্তদাতার রক্তে এইডস এর জীবানু থাকলে সেই রক্ত শরীরে নিলে, কোন এইডস আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত সিরিঞ্জ ব্যবহার করলে বা আক্রান্ত ব্যাক্তির ব্যবহৃত ব্লেড দিয়ে শেভ করলে, আরো লেখা আছে রঃং হড়ঃ ঃৎধহংসরঃঃবফ নু যধহফংযধশব, যঁমমরহম ড়ৎ ংরঃরহম নবংরফব তার মানে হলো এইডস আক্রান্ত পেশেন্টের পাশে থাকলে, হাত ধরলে বা জড়িয়ে ধরলে, একই গ্লাসে পানি খেলে, একই জামাকাপড় পড়লে এইডস সংক্রমন হয় না।
রাফি গুম হয়ে বসে থাকে।
টুসি : কিরে কথা বলছিস না কেন? আমার কথা বিশ্বাস হচ্ছেনা?
রাফি চুপ।
টুসি : ঠিক আছে কালকে তোকে আমার স্যারের কাছে নিয়ে যাবো, তার মুখ থেকে শুনলে নিশ্চই বিশ্বাস করবি।
কলিং বেল বাজে।
টুসি : যা দরজা খোল, দেখ কে এল এত রাতে।
রাফি বেরিয়ে যায়।

দৃশ্য – ৫৩
একইদিন রাত। রাফিদের বাসার দরজা। রাফি দরজা খুলে… ফিজা দাড়িয়ে।
রাফি : তুমি?
ফিজা : চলে যাব?
রাফি : ভেতরে আস।
এর মধ্যে মা আর বাবা এসে দাড়ায়।
আশফাখ : তুমি এত রাতে কি চাও?
এরমধ্যে টুসি আসে।
টুসি : আস ভেতরে আস, সঙ্গে জামাকাপড় কিছু এনেছ?
ফিজা সম্মতিসূচক মাথা নাড়ে। টুসি ফিজাকে নিয়ে ভেতরে যায়। মা আর আশফাক সাহেব অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকেন।

দৃশ্য – ৫৪
হাসপাতাল অনাদৃতা খানের বেডের পাশে আবু মিয়া বসা। স্যালাইন চলছে। অনাদৃতা খানের চোখ নড়ে, হাতের আঙ্গুল নড়ে, আবু মিয়া নড়েচড়ে বসে।
আবু মিয়া :আম্মা কেমন লাগে এখন।
অনাদৃতা খান : ফিজা কোথায়?
আবু মিয়া চুপ করে থাকে।
অনাদৃতা খান : কোথায়?
আবু মিয়া : আম্মা ছোট আম্মা বাসা থেইকা চইলা গেছে।
অনাদৃতা খান : কি?
আবু মিয়া : আপনের জানি কি মারণ রোগ হইছে, ডরে চইলা গেছে।
অনাদৃতা খান : কোথায় চলে গেছে?
আবু মিয়া : রাফি ভাইজানের বাসায়।
অনাদৃতা খান দীর্ঘনিশ্বাস ফেলেন।
অনাদৃতা খান : যাবেইতো … এই বিপদের সময় নিজের লোকেদের কাছেই গেছে।
আবু মিয়া চুপ করে দাড়িয়ে থাকে। অনাদৃতা খান দীর্ঘনিশ্বাস ফেলেন।

দৃশ্য – ৫৫
টুসির ঘর। ফিজা মন খারাপ করে বসে আছে। টুসি তার দিকে তাকিয়ে আছে।
টুসি : তুমি কাজটা ঠিক করোনি।
ফিজা চুপ।
টুসি : আমরা সবাই কি ভুল ধারনা নিয়ে বসে আছি।
ফিজা : ভুল?
টুসি : ভুল না? তুমি আমাকে বলতো তুমি তোমার মায়ের অসুখটা সম্পর্কে কি জানো?
ফিজা : সবাই জানে, এটা ঢোল পিটিয়ে বলার মত কিছু না।
টুসি : ওফ, ইউ পিপল আর ইমপসিবল। ফিজা তোমার মা মারা যাচ্ছে…।
ফিজা : জানি আরও জানি তার কাছে যাওয়াও রিস্কি।
টুসি : ভুল জান, তোমার মা এইচ আই ভি পজেটিভ, এই পেশেন্টের শেষ অবস্থা হচ্ছে মৃত্যু.. তার মানে এই নয় যে তার থেকে দুরে থাকতে হবে, এটা কোন ছোয়াচে রোগ না..।
ফিজা : কি বলছেন আপনি… রাফি যে বললো..।
টুসি : রাফি না জেনে বলেছে।
ফিজা বোকার মত বসে থাকে।
টুসি : আমরা এইচ আই ভি নিয়ে একটা ভুলের জগতে বাস করছি, এতে সমস্যা শুধু বাড়ছে, কমছে না।
ফিজা চুপ।
টুসি : আস আমার কাছে আস।
ফিজা উঠে গিয়ে টুসির কাছে গিয়ে বসে। টুসি তাকে জড়িয়ে ধরে।
টুসি : আমার উপর কি তোমার অনেক রাগ?
ফিজা মাথা নেড়ে হ্যা বলে, টুসি হাসে।
টুসি : বড়বোনের উপর রাগ করতে হয়?
ফিজা প্রায় কেঁদে ফেলে মাথা নেড়ে না বলে।
টুসি : যাও মা কিচেনে আছে দেখা করে আস।
দীদ্ধান্বিত ফিজা কিচেনের দিকে এগিয়ে যায়, টুসির ডাকে ফিরে তাকায়-
টুসি : মা বলে ডাকবে….।
ফিজা মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলে। ফিজা কিচেনের দিকে চলে যায়, টুসি পিছু নেয়।

দৃশ্য – ৫৬
কিচেনে মা বকবক করে কি যেন বলছেন, ফিজা পেঝনে দাড়ায়, আস্তে করে ডাকে-
ফিজা : মা…!
মা : কি চাস, আমার যত হয়েছে জালা, যার যা খুশী করবে, এখন আবার নতুন আপদ জোগার হয়েছে…।
টুসি এসে দাড়ায়।
ফিজা : মা!
মা : কি চাস… যা এখান থেকে।
ফিজা : মা!
মা চমকে উঠে ঘুরে দাড়ান।
ফিজা : মা!
মা মাথা ঘুরে পড়ে যেতেই ফিজা আর টুসি তাকে ধরে ফেলে।

দৃশ্য – ৫৭
অনাদৃতা খান শুয়ে ছিলেন হাসপাতালের বেডে, আবু মিয়াকে ডাকেন। আবু মিয়ার প্রবেশ।
আবু মিয়া : জ্বী আম্মা।
অনাদৃতা খান : আমার মাকে স্বপ্নে দেখলাম জান… মা মারা যাবার পর এই প্রথম স্বপ্নে দেখলাম।
আবু মিয়া চুপ।
অনাদৃতা খান : আমি কি মারা যাচ্ছি আবু মিয়া?
আবু মিয়া : এই সব আপনি কি কন আম্মা।
অনাদৃতা খান : দেশের বাড়িতে খবর পাঠাও.. আমার ভাইদের আসতে বল… আমি মারা যাচ্ছি আর আমার চারপাশ খালি কেন?
আবু মিয়া : খবর পাঠাচ্ছি আম্মা।
অনাদৃতা খান : এক্ষুনি পাঠাও এক্ষুনি, বল আমি মারা যাচ্ছি।
আবু মিয়া বেরিয়ে যায়।

দৃশ্য – ৫৮
মা শুয়ে আছে ফিজার কোলে মাথা রেখে.. তার প্রেসার চেক করছে টুসি .. রাফি দাড়িয়ে এমন সময় বাইরে থেকে আশফাক সাহেব প্রবেশ করেন।
আশফাক : কি হয়েছে?
মা লজ্জিত হয়ে উঠে বসার চেষ্টা করেন।
মা : এই একটু মাথা ঘুরে গিয়ছিল আর কি।
টুসি আর ফিজা একজন আরেকজনের দিকে তাকায়।
আশফাক সাহেব ফিজার পাশে বসেন।
আশফাক : তুমি যা অনিয়ম করোনা।
মা : আর অনিয়ম করবোনা, আমার নিজের মেয়ে এসে গেছেনা।
সবাই বিব্রত হয়ে ফিজার দিকে তাকায়।
মা : ভাল করে দেখ, আমার মেয়ে আমার মত হয়েছে না?
সাবাই আবার বিব্রত, ফিজার চোখে পানি। টুসি বিষয়টাকে হালকা করার জন্য বলে-
টুসি : আমি বুঝি তোমার নিজের মেয়ে না?
মা হাসার চেষ্টা করেন।
মা : তোরা সবাই আমার নিজের … সবাই।
বলে ফিজাকে কাছে টেনে নেন। আশফাক সাহেবকে বলেন-
মা : এই তুমি আমার মেয়েটার মাথায় হাত রেখে একটু দোয়া করনা…. করনা।
আশফাক সাহেব বিব্রত। ফিজা তার কাছে যায়।
ফিজা : বাবা!
আশফাক সাহেব তার ফিরে পাওয়া মেয়েকে জড়িয়ে ধরেন।
আশফাক : মারে আমাকে মাফ করে দে মা… আমাকে মাফ করে দে।
সবার কান্না এক বেদনাবিধুর পরিবেশ তৈরী করে। সবার অলক্ষে রাফি চলে যায় বারান্দায় তাকিয়ে থাকে রাতের তারা জলজল করা আকাশে।

দৃশ্য – ৫৯
সময় পরদিন সকাল। লং শটে বারডেম হাসপাতাল। কাট টু বারডেম হাসপাতাল করিডোর। রাফি, টুসি আর ফিজা হেটে আসছে ।
টুসি : এখানে কেন নিয়ে এলাম জান? তোমাদেরকে আজকে আমার স্যারের কাছে নিয়ে যাব, তার কাছ থেকে তোমরা শুনবে ফিজার মায়ের অসুখ সম্পর্কে, তাহলে এইচ আই ভি নিয়ে তোমাদের যত ভুল ধারনা আছে তা চলে যাবে। আস….।
তারা একজন ডাক্তারের চেম্বারে ঢুকে যায়।

দৃশ্য – ৬০
টুসির স্যার বড় কোন এইচ আইভি স্পেশিয়ালিষ্ট বসে আছেন…।
স্যার : আস আস… এদের কথাই বলছিলা টেলিফোনে?
টুসি : জ্বী স্যার, এই হচ্ছে রাফি আর ফিজা আমার দু ভাইবোন।
স্যার : বস বস… কি খাবা বল.. অবশ্য হাসপাতালে সুস্থ লোকের খাওয়া দাওয়া আমি প্রেফার করি না..।
টুসি : আমি তাহলে স্যার ওয়ার্ডটা একটু ঘরে আসি, আপনি ওদের সাথে কথা বলুন।
স্যার : হ্যা হ্যা সেই ভাল, তবে বেশী দেরী করোনা… ওদেরকে একটু এইচ আই ভি টেস্টিং প্লান্টটা ঘুরিয়ে দেখাতে হবে… তাড়াতাড়ি চলে এস।
টুসি : জ্বী স্যার।
টুসি চলে যায়।
স্যার : আস আমার কম্পিউটারে কিছু ইনফরমেশন আছে তোমাদের সঙ্গে শেয়ার করা যাক… কিন্তু একটা শর্ত আছে তোমরা লজ্জা পাবেনা, লজ্জা হচ্ছে ভয়ংকর জিনিষ, লজ্জা থেকে অজ্ঞতা জন্ম নেয়, আর অজ্ঞতা থেকে অনেক বড় বড় ভুলের, এ্যাম আই ক্লিয়ার?
রাফি আর ফিজা দুজনেই সম্মতিসূচক মাথা নাড়ে।
স্যার তার কম্পিউটারে এইডস বিষয়ক ফোল্ডার খুলেন। সেখানে কিছু সিজি আছে, সিজি চলতে থাকে আর স্যার বলতে থাকেন, এখানে সিজি ফুলস্ক্রিনে দেখাতে হবে।
সিজি :
১. কি কি কারণে এইডস হয়- মূলত সেক্সুয়াল কন্টাক্টের মাধ্যমেই এইচ আইভি ছড়ায়, এছাড়াও অপরীক্ষিত রক্ত সঞ্চালনের মাধ্যমে, ইনজেকশনের সিরিঞ্জ, এইডস আক্রান্ত গর্ভবতী মায়ের গর্ভের শিশুর অথবা মায়ের স্তন নিসৃত দুধ পান করলে শিশুর এইচ আইভি আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা থাকে।
২. কিভাবে পরীক্ষা করাতে হবে এইডস আছে কিনা এবং কোথায়
৩. পরিনাম কি? — পরিনাম মৃত্যু
৪. কোন চিকিৎসা আছে কিনা— এর কোন চিকিৎসা নেই
৫. কি করে ছড়ায় না- আক্রান্ত ব্যাক্তির স্পর্শের মাধ্যমে, টাউয়েল ব্যবহারে, বিছানার মাধ্যমে, টেলিফোনে, সুইমিং পুলের মাধ্যমে, একই টয়লেট ব্যবহারে
৬. কিভাবে সতর্ক থাকা যায়
৭. এইডস রোগীর সাথে কি রকম আচরণ করতে হবে- একজন এইডস আক্রান্ত রোগীর সাথে খুবই মানবিক আচরন করতে হবে, কারণ তার মতো অসহায় কেউ নেই, সে একজন মৃত্যুপথযাত্রী, সে পৃথিবীর সবচে মানবিক আচরন পাবার দাবীদার। অন্যান্য রোগের মতও এইডস একটি রোগ, অন্য রোগীকে আমরা যেমন গুরুত্ব দিয়ে সেবা করি সেই একই গুরুত্ব একজন এইডস আক্রান্ত রোগীকেও দিতে হবে, কারণ আমাদের লক্ষ্য হবে রোগকে ঘৃণা, রোগীকে নয়।

দৃশ্য – ৬১
টুসি রাফি আর ফিজাকে নিয়ে এইচ আই ভি টেস্টিং প্লান্টে প্রবেশ করে। সেখানে কি করে টেষ্ট করাতে হয়, কত টাকা লাগে ইত্যাদি ব্যাখা করবে।

দৃশ্য – ৬২
অনাদৃতা খানের কেবিন, তার শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। একটু দুরে বসে আবু মিয়া ঝিমাচ্ছে।

দৃশ্য – ৬৩
ফিজা, রাফি আর টুসি বারডেমের করিডোর ধরে এগিয়ে যায় অনাদৃতা খানের কেবিনের দিকে।

দৃশ্য – ৬৪
সহসা দরজা ঠেলে ফিজা প্রবেশ করে, তার পেছনে রাফি আর টুসি। ফিজা অনাদৃতা খানের বুকে ঝাপিয়ে পড়ে।
ফিজা : মা মা…।
অনাদৃতা খান ইশারায় খুশী হবার ভঙ্গি করেন, তার শ্বাসকষ্ট বাড়তে থাকে, তিনি রাফির দিকে তাকিয়ে হাত বাড়ান, রাফি এগিয়ে এসে তার হাত ধরে, তিনি হাসেন, টুসি এগিয়ে এসে তার মাথায় হাত রাখে, তিনি ফিজার দিকে তাকান। তার চোখ জ্বলজ্বল করছে, তিনি ধাক্কা দিয়ে অক্সিজেন মাস্ক খুলে ফেলেন, ফিজার মাথা ধরে তিনি কপালে চুমু খান, ফিজা কেঁদে উঠে, তিনি মুখে আঙ্গুল তুলে চুপ বলেন, ফিজা তাকে জড়িয়ে ধরে, তার শ্বাসকষ্ট বাড়তে থাকে, ডাক্তার এসে প্রবেশ করেন, অক্সিজেন মাস্ক পড়িয়ে দেন, তিনি মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন, ডাক্তাররা অনেক ছুটেছুটি করেও কিছু করতে পারে না, তার স্থির মুখ থেকে প্যান করলে দেখা যায় তার হাতে ধরা ফিজার একটি হাত। সেখান থেকে প্যান করলে দেখা যায় ফিজা পাথর হয়ে বসে আছে।

স্ত্রিনে ভেসে ওঠে- দেয়া আর নেয়ার এই পৃথিবীতে মাঝে মাঝে দেয়া আর নেবার কিছুই থাকে না, থাকে শুধু কিছু দীর্ঘশ্বাস..(রবীন্দ্রসঙ্গীত- বধূ কোন আলো লাগলো চোখে..)
ফ্রিজ
সমাপ্ত