আমি শমিক
এরশাদ আমলের শেষ দিক। আন্দোলন শেষ পর্যায়ে। ডিসেম্বরের ছয় তারিখ এরশাদের পতন হলো। আমার সাংস্কৃতিক জোটের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হলো নানান পারিবারিক কারণে। আর আমিও টায়ার্ড ছিলাম পুরো আন্দোলনের পর্যায়টা মাঠকর্মী হিসাবে কাজ করে। আমি তখন বেশী মনোযোগী হলাম ক্যারিয়ার নিয়ে। চাকরী করার চেষ্টা, আর সঙ্গে ছোটখাট ব্যবসা এই নিয়ে প্রানান্তকর চেষ্টা, এর মধ্যে আমার জীবনে প্রথম প্রেম এল। অন্য আর আট দশটা সাধারন মানুষের মত আমিও প্রথম প্রেম নিয়ে খুব উ”ছসিত হলাম। জীবন মনে হতে লাগলো কত সুন্দর। কিš‘ এই প্রথম প্রেমই যে মানুষ সম্পর্কে সমস্ত বিশ্বাস ও চেতনা বদলে দেবে, তা আমি বুঝতে পারিনি।
লিমার সঙ্গে আমার পরিচয় হয় ফোনে। আমার বন্ধু রাশেদ আমাকে একটা ফোন নাম্বার দিয়ে বলে আলাপ করতে। রাশেদের ফোন ফ্রেন্ড ছিল সুরভী, লিমা তার কাজিন। লিমার মা ছিলনা, ছিলনা মানে তার মা তাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল তার বাবারই এক বন্ধূর সঙ্গে। লিমার বাবা সেই দুখেঃ বুকে পাথর বেধে চার বছরের মেয়েকে নিয়ে দীর্ঘ সময় পার করেছেন। আমার সঙ্গে লিমার যখন প্রথম দেখা হয় তখন সে ক্লাস এইটে পড়ে। লিমা দেখতে শ্যামবর্ণ ছিল, কিš‘ তার চেহারায় ছিল আশ্চর্য মায়াময় একটা দ্যুতি যা মানুষকে সহজেই আকর্ষন করবে। এসব কারণেই হয়তো লিমাকে আমার ভাল লেগেছিল। আমি তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়–য়া একটা ছেলের স্কুলের একটা মেয়ের প্রেমে পড়ার কথা না, কিš‘ আমি পড়েছিলাম। আমি কো এডুকেশন স্কুলে পড়ি নাই, মেয়েদের সঙ্গে খুব একটা মিশি নাই, বাবার কড়া শাসনে ছিলাম বলে পাশের বাড়ির মেয়েদের সঙ্গেও আমার উঠাবসা শুধুমাত্র চোখাচোখির পর্যায়ে ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকে সমবয়সী মেয়েদের প্রেমে পড়াটাই আমার সমীচিন ছিল। কিš‘ কি যেন এক অজানা ভয়ে আমি আমার ক্লাসের মেয়েদের এড়িয়ে স্কুলের একটা ছোটখাট মেয়ের প্রেমে পড়লাম। রাশেদের দেয়া ফোনে একদিন চেষ্টা করতেই সুরভীর সঙ্গে কথা বললাম, সেই খেলা সপ্তাহ দুয়েক চললো, পনের দিন পরে সুরভী ঝেড়ে কাশলো, আমি জানতে পারলাম, সুরভী অলরেডি এনগেজড, তবে তার চাচাতো বোন লিমা খালি আছে- আমি যদি রাজি থাকি তাহলে সে আমার জন্য চেষ্টা করতে পারে। আমি নাই মামার চেয়ে কানা মামা … না মামি ভাল.. এই ভেবে রাজি হয়ে গেলাম।
আমাদের প্রথম দেখা কি করে হবে ফোনে সেই নিয়ে চলল গবেষনা। লিমা ফোনে আমাকে থামাতে চেষ্টা করলো, কিš‘ আমার জেদ চেপে গেল। কোন এক দুঃসাহসী বিকেলে সুরভীদের বাড়ির সিড়ি বেয়ে তিন তলায় উঠে কলিংবেল বাজিয়ে বসলাম। লিমা দরজা খুলে আকাশ থেকে পড়লো-
লিমা : তুমি কি পাগল? তোমাকে মানা করলাম আসতে, চাচী দেখলে কেটে ফেলবে তোমাকে।
আমি : কেটে ফেলুক।
লিমা : তুমি যাবা?
আমি : যেতে পারি এক শর্তে?
লিমা : কি শর্ত?
আমি : একটা চুমু খাও
লিমা চোখ কপালে তুলে বলল- কি?
দড়াম কওে মুখের উপর দরজা বন্ধ করে দিল। আমি ভগ্ন মনোরথ হয়ে ফিরে আসলাম। ফিরেতো আসলাম, মনটা পড়ে রইলো মায়াবী চোখের মেয়েটার উপর। এত সুন্দর করে চোখ বড় বড় করে কি বললো । আমি ভুলতেই পারছিনা সেই চাহনি।
দুদিন পড়ে আবার তিনতলায় উঠে বেল বাজালাম। লিমা দরজা খুলতেই হাত ধরে একটান দিয়ে চারতলার সিড়িঘরে নিয়ে গেলাম। জড়িয়ে ধরে ঠোটে ঠোট ডুবিয়ে দিলাম। প্রথমে একটু বাধা দিল, তারপর সেও সাড়া দিল। কিছুক্ষন .. এই কয়েক সেকেন্ড.. তারপর একধাক্কায় আমাকে ফেলে দিয়ে দৌড়ে নীচে চলে গেল, দরজা বন্ধ। আমি হতবিহব্বল হয়ে ফিরে এলাম। সন্ধ্যায় ফোন এল-লিমা গম্ভীর গলায় বলল- আমার মধ্যে তুমি কি পাইলা, কালো একটা মেয়ে, দেখতে সুন্দর না।
আমি- কালোই আলো।
লিমা- কবিতা লেখ?
আমি- কবিতা বলি।
লিমা- কি চাও আমার কাছে।
আমি- চাই— কিছু দিতে।
লিমা- কি?
আমি- নিজেকে।
লিমা -আবার কবিতা?
আমি- বাদ দেই তাহলে।
লিমা- না বল।
আমি – কি?
লিমা – কবিতা।
তারপর খিলখিল হাসি। আমি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকি। সে হাত নেড়ে নেড়ে কতকিছু বলে। আমি কিছু শুনিনা। তাকিয়ে থাকি। কোন এক সন্ধ্যায় ডাক আসে লিমার নিজের বাড়িতে। বাসায় কেউ নেই। অনেক রাত পর্যন্ত তার হাত ধরে বসে থাকি। এমন আরও অনেক সন্ধ্যা আসে আমাদের দুজনার। একদিন ধরা পড়ে যাই ওর বাবার কাছে। কলিংবেল টিপতেই ওর বাবা দরজা খুলেই জিজ্ঞেস করেন- লিমার কাছে এসেছ?
আমি নিঃশব্দে মাথা নাড়ি। উনি বললেন- ভেতরে আস। ড্রইংরুমে বসিয়ে ভেতরে গেলেন। ফিরে এলেন সার্টের বোতাম লাগাতে লাগাতে।আমি ভেতরে ভেতরে শুকিয়ে যা”িছ। না জানি কি শুনতে হয়।
বাবা- আমাকে লিমা সব বলেছে তোমার সম্পর্কে। মা মরা মেয়ে, তাই কিছু বলিনা, ছোট মানুষ ভুল করতেই পারে। কিš‘ তুমিতো ছোট না। ক্লাস এইটের একটা মেয়ের পেছনে কি মনে করে পড়লা তুমি।
আমি চুপ। লজ্জায় কান গরম করে বসে আছি, উনি আর কিছু বলেন কিনা, নিজের উপর অনেক রাগ হ”েছ, কিš‘ প্রতিজ্ঞা করেছি মুখ খুলবোনা। কিছুক্ষন চুপ থেকে উনি বললেন- বস, লিমাকে পাঠিয়ে দি”িছ।
আমি হাফ ছেড়ে বাচলাম। লিমা আসলো, চোখ ফোলা, বুঝলাম কেঁদেছে অনেকক্ষন। দুজনেই চুপ কিছুক্ষন। তারপর-
লিমা : তুমি অনেক মাইন্ড করেছ?
আমি : আমার মন নাই।
লিমা : অনেক বেশী রাগ হয়েছ? আমি আসলে বাবাকে কোন কিছু না বলে থাকতে পারিনা। মা চলে যাবার পর (আমি চোখ তুলে তাকালাম, লিমা চুপ করে আছে, অনেকক্ষন পর ) আমার মা আর বাবা প্রেম করে বিয়ে করেছিল, আমার যখন ৪ তখন আমার মা, বাবার এক বন্ধুর সঙ্গে পালিয়ে … লিমা কিছুক্ষন চুপ করে রইলো। তার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। আমার মনে হলো আমি তার থেকে কত দুরে..। আমার মা আছে, বাবা আছে ভাইবোনরা আছে, তাদের ভালবাসা আমি পেয়েছি, সান্নিধ্য পেয়েছি- আর কিছু না হোক নিজের মা পালিয়ে গেছে বাবার বন্ধুর সঙ্গে- এত বড় অসম্মানের কথা- অন্য একজনের সঙ্গে শেয়ার করতে হ”েছ না— এর চেয়ে বেশী চাওয়া আর কি তাকতে পারে। লিমা চুপ করে চোখের পানি ফেলছিল। হয়তো তার চিৎকার করে কাঁদতে ই”েছ করছিল, কিš‘ হয়তো সে পারছিল না, কোন লজ্জায়- কোন শংকায় যেন সে কুঁকড়ে ছিল- বৃষ্টিতে ভেজা হাঁসের ছানার মত। আমি আস্তে করে এগিয়ে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরলাম। সে আমাকে জড়িয়ে ধরে হু হু করে কেঁদে উঠলো- কিš‘ সেটাও নিঃশব্দে। আমার বুকের কাছে শার্ট ভিজে গেল, হয়তো ভেজা শাটের নিচে হৃদয়ও ভিজে গেল অনেকটা। সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হয়ে গেল। আমরা ওভাবেই বসে রইলাম। হঠাৎ কলিংবেল বাজলো, শ্যামা দৌড়ে গেল দরজা খুলতে। লিমার বাবা এসে ঢুকলেন কাক ভেজা হয়ে, বাইরে বৃষ্টি হ”িছল, আমরা কিছুই টের পাইনি- আমাদের ভেতরেও বৃষ্টি হ”িছল যে। ড্রইংরুমে মুখ ঢুকিয়ে তিনি বললেন- আছ এখনও, চা খাবে?— আমি হাসলাম।
লিমার বাবার প্রশ্রয়ে আমাদের সম্পর্ক এগিয়ে চললো। আমার সমস্ত সত্ত¡া জুড়ে ছিল সে।একদিন তার বান্ধবির একটা ছবি এনে আমাকে দেখাল। একটা ছেলে একটা মেয়েকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে বসে আছে। বলল- আমার বান্ধবি কলি। আমি বললাম- ছেলেটি কে? লিমা বলল- ওর বয়ফ্রেন্ড। আরেকটা ছবি নিয়ে আসলো- সেখানেও কলি- কিš‘ আরেকটা ছেলের সঙ্গে কোন একটা পার্কের বেঞ্চে ঘনিষ্ঠ হয়ে বসে আছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম- এই ছেলেটি কে? লিমা বলল- এটাও বয়ফ্রেন্ড। আমার সব বান্ধবীর ৫/৬ টা করে বয়ফ্রেন্ড। ১টা রিয়েল আর কয়েকটা ছায়া বয়ফ্রেন্ড।
আমি- ছায়া বয়ফ্রেন্ড আবার কি?
লিমা- একটা আসল, আর বাকিরা টাইম পাস।
আমি- এইটা কি ধরনের কথা।
লিমা- আরে, একটায় চলে নাকি, ৬ জন মানে- ৬টা গিফট, পকেট ফাকা ৬ জনের, মাস্তি ৬ ধরনের, তুমি বুঝবা না.. তুমি একটা বেকুব।
আামি- তোমার কয়টা?
লিমা- সেটা তোমাকে বলবো কেন?
আমি- আমি কি আসল নাকি ছায়া।
লিমা আমার দিকে কঠিন দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষন, তারপর উঠে চলে গেল। মিনিট দশেক পড়ে ওদের কাজের মেয়ে এসে বললো- আফামনির মাথা ধরছে- আফনেরে চইলা যাইতে বলছে। আমি হতভম্ভের মত বসে রইলাম কিছুক্ষন। তারপর উঠে বাইরে চলে এলাম। নিজের কানকে বিশ্বাস হ”িছল না। একি শুনলাম আমি। নিজেকে আমার ছায়াফ্রেন্ড মনে হতে লাগলো।
ছায়াফ্রেন্ড আমি- ফাঁকা মাথা নিয়ে ঘুরে বেড়াই, আর বড় বড় নীতিকথা মাথায় ঘোড়ে। অন্য কিছু ভাবার চেষ্টা করি। লিমার থেকে দুরে থাকার চেষ্টা করি। কে যেন বলেছিল- যুদ্ধ আর ভালবাসায় ন্যায় -অন্যায় বলে কিছু নেই। তবু কোনভাবেই মন মানেনা। ছায়াফ্রেন্ড নামক অনৈতিক একটা শব্দ মাথার মধ্যে ঘুরপাক খা”েছ অবিরত। ঘুম আসেনা, খেতে ভাল লাগেনা- কি করব- কিছুই ঠিক করতে পারিনা। তারপরও মন থেকে সব ঝেড়ে ফেলে লিমার সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। লিমা ঠোট ফুলিয়ে বলল- এতদিন কোথায় ছিলে? আমি হাসি। আমার হাত ধরে ঠোটে ঠোট ডুবিয়ে দেয়। আমিও আত্মসমর্পণ করি। চুমু খেতে খেতে হঠাৎ মনে হয়- এ চুমু ছায়াফ্রেন্ড এর জন্য বরাদ্দ নয়তো? আমি অভিনয় করতে থাকি, তার আদরে সাড়া দিতে থাকি, সাড়া দিতে দিতে একসময় সম্পর্কের অনেক বড় বাধা পার হয়ে যাই আমরা। মন আমার সাড়া দেয় না, শুধু শরীর সাড়া দেয়, একসময় ক্লান্ত হয়ে পড়ে থাকি। লিমা উঠে যায়। ফ্রেশ হয়ে ফিরে আসে। বলে- আমার উপর রাগ করেছ? আমি হাসি। আমার হাত ধরে লিমা বলে- তোমাকে কলির ছবি দেখানো ভুল হয়েছে আমার। তুমিই আমার সব। তোমাকে ছাড়া আমি অন্যকিছুই ভাবিনা। লিমা আবার চুমু খায়। আমি সত্যি সত্যি তাকে বিশ্বাস করার চেষ্টা করি। ভুলে যাবার চেষ্টা করি সেদিন কি ঘটেছিল।সবকিছু ছাপিয়ে লিমার সঙ্গে আমার সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়ে যায়- আমি জানিনা সেটা খানিকটা শরীরের লোভে কিনা। আবার যাওয়া আসা শুরু।
এর বছর খানেক পর আমি ঠিক করলাম- আমার মাকে নিয়ে যাব ওদের বাসায়। লিমাকে বলতেই আতকে উঠলো-না না.. কি দরকার.. থাকনা— এই জাতীয় কথা বলে আমাকে ভুলানোর চেষ্টা করলো। আমি কোন ভাবেই পিছু হটলাম না। মাকে পাঠাবোই বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে।
কোন এক অশুভ বিকেলে আমি আমার মাকে নিয়ে লিমার লিগাল গার্জিয়ান শ্যাামার চাচীর সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। আমাকে ড্রইংরুমে বসিয়ে রেখে আম্মাকে নিয়ে চাচী ভেতরে গেলেন। আমার জন্য চা নিয়ে এল লিমা। বলল- চাচী কথা বলছে আম্মার সাথে। লিমার মুখে নিজের মাকে মা বলতে শুনে এত ভাল লাগলো.. লিমাকে এত আপন লাগতে লাগলো.. এত আপন কাউকে কখনও লাগেনি আমার। একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে বসে রইলাম আমি। সেদিন রাতে যখন বাসায় ফিরছিলাম .. তখনও আমি বুঝতে পারিনি.. আমার আপন মানুষটি অন্য একজনের বুকে মাথা রেখে তার আপন হবার জন্য হাসপাশ করছে।
আম্মাকে নিয়ে ফিরে আসার পরদিন থেকে লিমা যেন কেমন হয়ে গেল। ফোন ধরে না ঠিকমত, বাসায় গেলে বেশীক্ষন কথা বলে না। কাছে আসে না, সোফার এককোনায় আমি আরেক কোনায় সে বসে থাকে। হাত ধরতে দেয়না, চুমু খেতে দেয়না, কেমন যেন অচেনা মানুষ হয়ে যায় ধীরে ধীরে.. প্রশ্ন করি– কেন লিমা? উত্তর আসে— আমার মনে হয় তুমি আমাকে ভুলে যাও। আমি তোমার জন্য না.. ব্রোকেন ফ্যামিলির একটা মেয়ে আমি, আমার জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে তোমার জীবন নষ্ট করোনা, তোমার ব্রাইট ফিউচার।
আমি চোখে অন্ধকার দেখি , নিজেকে ছায়াফ্রেন্ড মনে হতে থাকি। সেখান থেকে ফিরে সংসদ ভবনের ফাকা রাস্তার ডিভাইডার ধরে হাটতে থাকি নাটকের ছ্যাকা খাওয়া নায়কের মত। হঠাৎ মনে হয় , আরে এতো পরিচিত দৃশ্য– একটা ছেলে একটা মেয়েকে ছ্যাকা দেবার আগে এসব ডায়লগইতো দেয়। এতো দুইএ দুইএ চার। কিš‘ আমার সঙ্গে কেন এমন হবে? আমার কি অপরাধ। অন্য আট দশটা ছ্যাকা খাওয়া বোকা নির্বোধ প্রেমিকের মত আমিও হাতিপাতি করে খুজতে থাকি কারনসমূহ। কি কি কারনে সম্পর্ক ভেঙ্গে যায় এই বিষয়ক রচনা লিখি গভীর রাত পর্যন্ত বসে বসে। রচনা হয়না সেটা হয়ে যায় দীর্ঘ প্যান প্যানানি চিঠি যা আমি প্রতিদিন সকালে স্কুলের গেটে গিয়ে লিমাকে দিয়ে আসি। কিš‘ কোন জবাব পাই না। একদিন জিজ্ঞেস করি— ৪৭ টা চিঠি দিলাম.. একটারও কোন জবাব নেই? লিমা বলে- এত সুন্দর তোমার চিঠিগুলো-কিš‘ কোন জবাব আমার কাছে নেই।
আমি রাতের পর রাত নির্ঘুম কাটাই। ছাদে গিয়ে চিৎ হয়ে শুয়ে থাকি। আহা কি রোমান্টিক সেই দিনগুলো। লিখতে বসে মনে হয়– বেচারা, কি বোকাই না ছিলাম আমি। ছিলাম বলছি কেন, হয়তো এখনও আছি। আমি বোকা ভালবাসি, আমি বোক খাই , বোকা ঘুমাই, আমার বোকাত্ব নিয়ে হয়তো আমার অহংবোধও আছে খানিকটা। নিজেকে ধূর্ত ভাবতে, কারো সঙ্গে চালাকী করতে কখনোই ভাল লাগেনি, করিওনা।
হটাৎ একদিন চাচীর বাসার সামনে দেখা সুরভীর সঙ্গে– সুরভী বলে -আপনেতো গাধা লোক শমিক ভাই.. লিমার তো আরেকটা এ্যাফেয়ার হইছে। ছেলে কম্পিউটার প্রোগ্রামার।নাম সাঈদ। ঘোরাঘুরি বাদ দেন.. নিজের রাস্তা দেখেন। নতুন নাগর পায়া লিমা আপনের কথা মনে রাখছেনি।
আমি, অবাক হয়ে থাকিয়ে রই সুরভীর দিকে, একটা মেয়ে আরেকটা মেয়ে সম্পর্কে এমন নোংরা ভাবে কথা বলে কি করে? তারা আবার সম্পর্কে কাজিন।
আমি হাটা শুরু করলাম, অনেকক্ষন হাটার পর দেখি- ছিলাম এলিফেন্ট রোড… এখন আছি মতিঝিল শাপলা চত্বর, হাটতে হাটতে চলে গেলাম সদরঘাট.. নৌকায় উঠলাম… অনেকক্ষন পানির দিকে তাকিয়ে ছিলাম, সন্ধ্যা নেমে এল, মনে হল ঝাপ দেই পানিতে , সাতার জানতাম আমি, কোন লাভ হবেনা, তাই চিন্তা বাদ দিলাম। রাত হয়ে গেল মাঝি বললো, ভাইজান বাড়িত যান, এত ভাইবা লাভ নাই… কিছু হারাইছেন? কেউ কষ্ট দিছে মনে? আমি মুখ তুলে তাকালাম। কি প্রান্তিক প্রশ্ন.. আমিতো মনে হয় সব হারিয়েছি। নদীর তীরে বসে রইলাম অনেক রাত পর্যন্ত। ভোরের দিকে বাসায় ফিরলাম। মা বসে আছে। আব্বা বিছানা থেকে উঠে এসে দিলেন এক চড়। মাথা ঘূরে পড়ে গেলাম। আম্মা ধরে উঠালেন। চাদর গায়ে শুয়ে পড়লাম। কাপুনি দিয়ে জ্বর এল। জ্বর আসে, যায়না। ৩ দিন- ৭দিন- ডাক্তারবলে বøাড টেস্ট করান- রিপোর্ট আসলো জন্ডিস। ২২ দিন অসু¯’ হয়ে পড়ে রইলাম বিছানায়। অনেক কেদেছি এই কয়দিন, গামলা ধরে রাখলে ১৫ কেজি হত শিওর। আর নিজেকে স্বান্তনা দিয়েছি- আমিতো ছাত্র.. লিমা বোধহয় তার জন্য চাকরীজিবি খুঁজছিল- যার উপর সে আ¯’া রাখতে পারে। মাসে মাসে বাড়ি ভাড়ার চিন্তা, খাওয়া পড়ার চিন্তা করতে হবেনা। আমি কবে পড়াশোনা শেষ করবো.. কবে চাকরি হবে.. ততদিনে ভাল পাত্র থাকে কিনা?
২৫ দিন পরে যখন ইউনিভার্সিটি গেলাম, শরীর বেশ হালকা লাগছে। বন্ধুরা দেখে হই হই করে উঠলো। বসে আছি মধুর কেন্টিনের সামনে একটা ছেলে এসে বললো আপনারে ডাকে। আমি বললাম- কে? সে বললো- ওইযে বটতলায় বইসা আছে। আমি বললাম- তারে আসতে বলো। বটতলায় বসে থাকা ছেলেটা এগিয়ে এল। জিজ্ঞেস করে— আপনার নাম শমিক?
বললাম- জ্বী সে বললো-আমি সাঈদ।
আমি- ওহ আপনি?
সাঈদ- আপনি আমাকে চিনতে পেরেছেন?
আমি- সুরভীর কাছে আপনার নাম শুনেছি।
সাঈদ- আমি একটা সত্য জানতে চাই।
আবি- বলেন?
সাঈদ- লিমার সাথে আপনার সম্পর্কটা কতদুর ছিল?
আমি তাকিয়ে রইলাম, প্রশ্নটা বোঝার চেষ্টা করলাম।
সাইদ- না মানে আমরা বিয়ে করতে যা”িছ সামনের মাসে, আমার বিষয়টা জানা দরকার?
আমি- কি জানতে চা”েছন বুঝতে পারছিনা।
সাইদ- না মানে জানতে চা”িছ আজকালকার প্রেমের সম্পর্কে অনেক কিছুই হয়, সেরকম কিছু..
আমি- সত্য বলবো না আপনি খুশি হবেন এমন কিছু বলবো?
সাঈদ- সত্য বললে খুশি হব।
আমি- সত্য মিথ্যা তো আপেক্ষিক সাঈদ সাহেব। আপনার কাছে যেটা সত্য– সেটা আমার কাছে সত্য মনে নাও হতে পারে।
সাঈদ- কি বলতে চাইছেন আপনি।
আমি- কিছুনা, আসি সাঈদ সাহেব।
সাঈদ- না সত্য কথা না বললে আপনাকে আমি যেতে দেবনা।
আমি- আমিত যাবোনা সাঈদ সাহেব, এটা আমার এলাকা, এখানে আমি পড়ি, আপনি আউটকামার, যেতে হলে আপনি যাবেন। আমি আপনাকে কিছুই জানাবোনা, আমাকে বিরক্ত করবেন না প্লিজ। খোদাহাফেজ।
সাঈদ চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইলো। আমি তার অগ্নিচক্ষু উপেক্ষা করে উঠে আসলাম। একজন হবু স্বামী তার হবু স্ত্রীর সতিত্ব আছে কিনা, সেটা জানতে চা”েছ হবু স্ত্রীর প্রাক্তন প্রেমিকের কাছে। হাসি পেল আমার। আমি বাসায় ফিরে সুরভীকে ফোন দিলাম। সুরভী সব শুনে বললো- আপনে কি সব কয়া দিছেন ছ্যামড়ারে? আপনে কি লিমার বিয়ায় ভাঙ্গানি দিতে চান? আমি বললাম- ছিঃ সুরভী আমি লিমাকে ভালবাসি. তার কোন অমঙ্গল হোক সেটা আমি চাই না। (সিনেমার এই ডায়লগ দিতে পেরে বেশ ভাল লাগছিল) সুরভী বললো- কওয়া আর বাকী রাখছেন কি?
এর ২০ দিন পর মহা ধুমধামে লিমার বিয়ে হয়ে গেল সাঈদের সঙ্গে। আমিও দাওয়াত পেয়েছিলাম। যাবার সাহস হয়নি। সাঈদ যদি আবার কোন প্রশ্ন করে। থাকনা তার কিছু প্রশ্ন অজানা। প্রশ্নগুলো হয়তো সারা জীবন উড়ে উড়ে যাবে তার চারপাশ দিয়ে।